বাঘাযতীন (Baghajatin)

বাঘাযতীন


"এত রক্ত ছিল মোর শরীরে?

ভাগ্যক্রমে, প্রতিটি বিন্দু অর্পণ করে গেলাম দেশমাতার চরণে।।"

 

উপরের এই কথাগুলি বলে গেছিলেন যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় তার একদম শেষ সময়ে। অনেকই হয়তো এই কথাগুলোর সাথে পরিচিত। আবার অনেকেরই হয়তো জানা নেই বিষয়টা। বাংলার বীর সন্তানদের কথা স্মরণ করে তাদেরকে জনগণের মধ্যে তুলে ধরার যে প্রয়াস শুরু করেছেন বিভিন্ন চলচ্চিত্র প্রযোজক এবং নির্মাতারা তাদেরকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। চলচ্চিত্র একটা মাধ্যম। এই মাধ্যমে যেমন জনগণের মধ্যে কিছু বার্তা পৌঁছানো যায় আবার এই মাধ্যমেই তুলে ধরা যায় কারোর জীবনকথা কিংবা তার কার্যকলাপ।

 

এবারের দুর্গাপুজোতে রিলিজ করেছে বিভিন্ন সিনেমা। তারমধ্যে অন্যতম হল বাঘাযতীন। এই সিনেমার একটা আলাদা উত্তেজনা অনেক আগে থেকেই ছিল। এর মূলত দুটি কারণ। প্রথমটি অবশ্যই মুখ্য চরিত্রের অভিনেতা দেব তথা দীপক অধিকারী। বর্তমান সময়ে যে কয়েকটি ভালো ভালো আর্ট ফিল্ম দর্শকদের উপহার দিয়েছেন, তাতে তার থেকে দর্শকদের এক্সপেক্টটেশন ভালোই। আর দ্বিতীয় হল বাঘাযতীন, যাকে নিয়ে এই গল্প; বাংলার অন্যতম বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়।




 


ছবি সৌজন্যে: গুগল (বাঘাযতীন Poster)

বাঘাযতীন সম্পর্কে কিছু কথা -

 

বাঘাযতীনের জন্ম অধুনা বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলায়। শৈশবে বাবার মৃত্যুর পর মামাবাড়িতে কিছুদিন তার জীবন কাটে। ভাইবোন বলতে ছিল বড় দিদি বিনোদবালা। মায়ের মৃত্যুর পর তার সঙ্গে বিবাহ হয় ইন্দুবালার। তাদের মোট চারজন ছেলে মেয়ে ছিল, কিন্তু প্রথমজন অতীন্দ্র বেশিদিন বাঁচেনি।

 

বাঘাযতীন কাজ করত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যেভুক্ত ভারতবর্ষের অর্থ দপ্তরে। তিনি ব্যারিস্টার কেনেডি সাহেবের সহকারী হিসাবে কাজ করতেন। প্রথম ছেলের মৃত্যুর পর সেই কাজ থেকে ইস্তফা দিয়ে দেয়।

 

অনুশীলন সমিতির একনিষ্ঠ সদস্য হিসাবে বাঘাযতীন বিখ্যাত ছিল। অনেকে বলতেন তিনি নাকি ঋষি অরবিন্দ ঘোষের ডানহাত ছিলেন। তারসাথে সেখানে অরবিন্দ ঘোষের ভ্রাতা বারীন্দ্রকুমার ঘোষের সঙ্গে মতবিরোধ হয় এবং ঘটনাচক্রে বারিণেরই হঠকারিতায় আলিপুর বোমা মামলার অধিকাংশ বিপ্লবী ধরা পরে যায়। আগ্রহী পাঠকরা এই বিষয়ে পড়াশুনা করতে চাইলে অন্তর্জাল এর ব্যবহার করতে পারেন, এছাড়া এই বিষয়ে বিভিন্ন বই আছে, সেগুলি পড়ে দেখতে পারেন।

 

কেন বাঘাযতীন?

 

এ তো সহজ বিষয় - বাঘ মেরেছে তাই বাঘাযতীন! যতীন্দ্রনাথ ও তার মামাতো ভাই ফনি বাঘ মারতে গেলে আচমকাই বাঘটি তাদের আক্রমণ করে। যতীন্দ্রনাথ একটা ভোজালি নিয়ে বাঘের সাথে যুদ্ধ করেছিল। প্রচন্ডরকম আহত হয় সে। সারা শরীর, বিশেষত তার পা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীকালে একটু হলেও খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হত যতীন্দ্রনাথকে। তবুও ওই ভোজালির সাহায্যে বাঘটাকে মারতে সমর্থ হয়েছিল যতীন। সেইথেকেই ইতিহাসে যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, বাঘাযতীন নামে পরিচিত।

 

এবার সিনেমার প্রসঙ্গে আসা যাক -

 

সিনেমার দুটি পর্ব। একটি বিরতির আগে, অন্যটি পরে। বিরতির আগে বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে দিয়ে এগিয়েছে সিনেমাটি, তাই গতি একটু স্লথ। অন্যদিকে বিরতির পরে মূলত বুড়িবালামের যুদ্ধই হল প্রধান আকর্ষণ। এখানে উত্তেজনাও চরম, গতিও বেশ ভালো।

 

মুখ্যচরিত্র বাঘাযতীন এর ভূমিকায় রয়েছে স্বয়ং দেব। দেবের এন্ট্রি মন্দ লাগেনি, তবে চরম কিছু নয়। এটা স্পয়লার হবে কিনা জানিনা, কিন্তু একটা কথা বলতেই হবে... ট্রেনে ওঠার সময় এক ধাক্কাধাক্কিতে দু-তিনজন ব্রিটিশকে ধরে পেটানোর মধ্যে দিয়ে দেব তথা বাঘাযতীনের এন্ট্রি। এটা আকর্ষক বটে, তবে দৃষ্টিনন্দন নয়। বাঘাযতীনকে সুপারহিরো হিসাবে দেখানোর অযথা প্রয়াস। এর থেকে গোলন্দাজ সিনেমায় নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী হিসাবে দেবের আবির্ভাব ছিল মারাত্মক।

 

আর একটা জিনিস হচ্ছে, বাঘাযতীন এর ছেলেবেলাকে একদমই অগ্রাহ্য করা হল। শৈশব, কলেজ, খেলাধূলা, বিপ্লবী সংগঠনের প্রাথমিক জীবন, চাকরিতে যোগ এগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে সযত্নে। শুরু থেকেই আমরা যৌবন প্রাপ্ত যতীন্দ্রনাথ মুখার্জীকে দেখতে পাই। ঘরে আছে বিবাহিত স্ত্রী ইন্দুবালা ও দিদি বিনোদবালা।

 

বাঘাযতীনের চরিত্রে দেব অনবদ্য। ব্যক্তিত্ব, হাটাচলা, তাকানো, অভিনয় সবদিক থেকেই অনন্য। তবে দেবের যে একটা উচ্চারণের সমস্যা রয়েছে, সেটা এখানে অতটা প্রকট হয়নি, কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে এখনও রয়ে গেছে। আজকাল ভয়েস ট্রিটমেন্ট বিভিন্ন রকমের হয়, সেই বিষয়ে একটু কনসাল্ট করতে পারলে আখেরে লাভ কিন্তু বাংলা সিনেমা জগতের।


ছবি সৌজন্যে: গুগল (বাঘাযতীন Poster)

 

এখানে আর একটা কথা বলতে হয়। ভিএফএক্স এর ব্যবহার আরও ভালো দরকার ছিল। বাঘাযতীন এর বাঘ মারার ঘটনা আরও সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলার দরকার ছিল। শুধু পায়ে বা পিঠে একবার ছোঁয়া দেওয়াই নয় বা ধরে রেখে বারবার আঘাত করে দেওয়াই নয়, এটা একটা মারাত্মক ঘটনা যতীন্দ্রনাথের জীবনে। সুতরাং, এই ঘটনার জন্য একটু সময় আর আরও ভালো এফেক্ট ব্যবহার অবশ্যই উচিত ছিল। এখানে ভিজুয়্যাল এফেক্ট পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে, যেটা চোখে লাগছে।

 

বাঘাযতীন এর স্ত্রী এর ভূমিকায় অভিনয় করেছে শ্রীজা দত্ত। আমার ওর অভিনয় বেশ ভালো লেগেছে। খুব বেশি ডায়লগ নেই। তবে ওর উপস্থিতি আর তার সাথে মৌন অভিনয় বেশ ভালো লেগেছে।

 

বিনোদবালা, অর্থাৎ বাঘাযতীনের দিদির ভূমিকায় রয়েছে সুদীপ্তা চক্রবর্তী। এককথায় অনবদ্য। বিপ্লবী মানে শুধু মাঠে নেমে যুদ্ধ নয়, ঘরের মধ্যে থেকেও যে যুদ্ধ করা যায় তা বিনোদবালা দেখিয়ে দিয়েছে। অসাধারণ অভিনয় করেছেন সুদীপ্তা।

 

এছাড়া আনুষঙ্গিক বিভিন্ন চরিত্র যেমন ক্ষুদিরাম এর ভূমিকায় সামিয়ুল আলম এর কাজ ভালো লেগেছে। রাসবিহারী বোসের চরিত্রে কোলাজ সেনগুপ্ত বেশ অভিনয় করেছেন। সন্দীপ ঘোষ অভিনয় করেছেন বারিণ ঘোষের চরিত্রে। সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন চরিত্রটিকে। বারিণের হঠকারীতা, এবং তার ফলপ্রসু ক্ষুদিরামের ফাঁসি কিংবা আলিপুর বোমা মামলা, এই ঘটনাগুলো বেশ ভালো বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। সজল মণ্ডল ছিলেন অরবিন্দ ঘোষের ভূমিকায়। ওনার কাজ নিয়ে আমার কোনও আপত্তি নেই। তবে বড্ড বেশি রোগা হয়ে গেছেন অরবিন্দ ঘোষ, আর একটু মাংস শরীরে থাকলে ভালো হত। আর চুলটা ঠিকঠাক হয়নি। ওটার আরও ভালো মেক আপ দরকার ছিল। চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরীর ভূমিকায় ছিলেন রোহান ভট্টাচার্য। ওর অভিনয় আগে দেখেছি। এখানেও রোহানের অভিনয় বেশ ভালো, ছটফটে।

 

কয়েকজন বিদেশীর চরিত্রে যারা অভিনয় করেছেন তাদের অভিনয়ও ভালোই লাগল। ভারতবন্ধু সাহেব কেনেডির চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন, বা তার মেয়ের ভূমিকায় রয়েছেন আমাদের পরিচিত আলেকজান্ডার টেলর (রেফারেন্স: আবার প্রলয়) ওনাকেও অল্প স্ক্রিন প্রেজেন্সে বেশ ভালোই লেগেছে। আর টেগার্টের ভূমিকায় যিনি কাজ করেছেন, অর্থাৎ কার্ল এ হার্টি ফ্যান্টাসটিক। বাঘাযতীন বনাম টেগার্টের লড়াইটা ছিল বেশ জমজমাট।

 

এইবারে এই সিনেমার গানগুলির প্রসঙ্গে আসা যাক। সবমিলিয়ে মোট আটটি গান আছে। গানগুলির লিরিক্স লিখেছেন নীলায়ন চ্যাটার্জী এবং সুরকারও নীলায়নবাবুই। এরমধ্যে সবথেকে আকর্ষণীয় লেগেছে অরিজিৎ সিং-এর কন্ঠে গাওয়া 'আসবো ফিরে' গানটা। এককথায় অসাধারণ। গায়ে কাঁটা দেওয়া, হৃদয় বিদারক এক সংগীত। এইকারণেই অরিজিৎ সিং হলেন বর্তমান সংগীত জগতে অন্যতম সেরা গীতিকার। এছাড়া স্নিগ্ধজিৎ ভৌমিক ও ইমন চক্রবর্তীর 'জাগো রে বাঘা' গানটি পুরো রোমাঞ্চকর আবহাওয়া তৈরি করার জন্য যথেষ্ট। গানের পাশাপাশি আর একজনের কথাও বলে রাখার দরকার আছে। তিনি হলেন মীর আফসার আলি ওরফে মীর। পুরো চলচ্চিত্রটি চলেছে তার ধারাভাষ্যের মধ্যে দিয়ে। মীরের অসাধারণ কন্ঠস্বরের কথা নতুন করে আর নাই বা বললাম। প্রতি শনিবার 'গপ্পো মীরের ঠেক'-এর মধ্য দিয়ে আমরা বারবার তার স্বাদ পেয়ে চলেছি।

 

বাঘাযতীন সিনেমার সমস্ত গান শুনতে ইউটিউব এর এই লিংকটিতে যেতে পারেন -

 

Ø https://youtu.be/7oC9l9M_ABQ?si=co63MgjtHhf-fgS5

 

পরিশেষে একটাই কথা বলার, বা অনুরোধও বলা যেতে পারে, এই ধরণের সিনেমা অর্থাৎ বাংলার বীর সন্তানদের চলচ্চিত্রের মধ্যে দিয়ে মানুষের মধ্যে স্মরণ করার যে প্রচেষ্টা তা যেন বারবার ফিরে আসে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কতজন তাদের কথা জানেন বা শোনেন, কিংবা ছোটদের কে তাদের জীবনের কথা, লড়াইয়ের কথা, সংগ্রামের কথা কতটা পড়ানো হয় বা পড়ানোর চেষ্টা করা হয় সেটাই একটা বড় প্রশ্নের জন্ম দেয়। কিন্তু বাঘাযতীনরা ফিরে আসে, তারা ফিরে আসে বারবার। তাই তো তিনি বলে গেছেন,

 

ফিরে আমি আসবোই,

হয় স্বাধীন ভারতের নাগরিক হয়ে

না হয় স্বাধীনতার স্বপ্ন হয়ে ....




ছবি সৌজন্যে:  Facebook

 

সিনেমা - বাঘাযতীন
রিলিজ তারিখ - ১৯শে অক্টোবর, ২০২৩
পরিচালক - অরুণ রায়
অভিনয়ে - দেব, শ্রীজা দত্ত, আলেক্সান্ডার টেলর, সামিয়ুল আলম, সুদীপ্তা চক্রবর্তী, রোহান ভট্টাচার্য, কার্ল অ্যানড্রিও হার্টি
সঙ্গীত - নীলায়ন চ্যাটার্জী, অরিজিৎ সিং, রূপম ইসলাম, স্নিগ্ধজিৎ ভৌমিক, ইমন চক্রবর্তী

*-*-*-*-*


Comments

Popular posts from this blog

'সুরাবর্দী অ্যাভিনিউ'-এর সুরাবর্দী কে ? || Suhrawardy Avenue

দার্জিলিং জমজমাট || Darjeeling Tour || Sittong, Mungpoo, Takdah, Tinchuley, Lamahatta || Mirik, Lepchajagat ||

কাকা-ভাইপো যা, মামা-ভাগ্নেও তাই !!! || সুরাবর্দী অ্যাভিনিউ || Suhrawardy Avenue