ব্যাণ্ডেল-এর আশেপাশে একদিন... ❣ | Hooghly Ghat, Bandel & Banshberia
হুগলী ঘাট থেকে ব্যাণ্ডেল হয়ে বাঁশবেড়িয়া : বছরশেষের এই দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা
বছরশেষের একদিনের ট্যুরে বেরিয়ে এলাম ব্যাণ্ডেল থেকে। তবে শুধু ব্যাণ্ডেল বললে ভুল হবে। একসাথে তিনটে স্টেশন কভার করা হচ্ছে বলতে গেলে। হুগলী ঘাট, ব্যাণ্ডেল আর বাঁশবেড়িয়া এই তিনটি জায়গারই বিভিন্ন দ্রষ্টব্য স্থান ঘুরে দেখলাম আমরা। আমরা বলতে, অর্ণব, দীপ আর আমি, আপনাদের সকলের প্রিয় প্রদীপ্ত।
ছবি: ব্যাণ্ডেল ও তার আশেপাশের কিছু জায়গা
🔶️ সকাল বেলায় বেরিয়ে পড়েছিলাম শিয়ালদহ থেকে কাটোয়া যাওয়ার গ্যালোপিং লোকালে। ট্রেনটা শিয়ালদহ থেকে ছাড়ে সকাল ০৮.০৬-এ। যেহেতু গ্যালোপিং লোকাল, তাই সব স্টেশনে থামে না। আমাদের বেলঘড়িয়াতে সময়, সকাল ০৮.২৬-এ। বেলঘড়িয়া থেকে উঠে পড়লাম আমি। আগেই শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে চেপে বসেছে অর্ণব আর দীপ। আমি দরজায় দাঁড়িয়ে প্রকৃতির হাওয়া খেতে খেতে চললাম নতুন কিছুর সন্ধানে.... 😇
ছবি: হুগলী ঘাট স্টেশনে নামার পর...
🔷️ আমাদের প্রধান যাত্রা শুরু হবে হুগলী ঘাট স্টেশন থেকে। এখান থেকেই আমরা বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখব। প্রথমেই একটা তালিকা করে রাখি যে কী কী জায়গা ঘুরে দেখলাম....
- ইমামবাড়া
- মহসিন্ এর টোম্ব
- ব্যাণ্ডেল চার্চ
- হংশ্বেশ্বরী মন্দির
- অনন্ত বাসুদেব মন্দির
- লাহিড়ীবাবার আশ্রম : আঁধারালয়
এর এর সাথে যাতায়াতের পথে পড়া টুকটাক বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান... 🙂
🔶️ হুগলী ঘাটে নেমে সেখান থেকে আমরা গেলাম আমাদের প্রথম গন্তব্য ইমামবাড়াতে। হুগলী ঘাট স্টেশন থেকে হাঁটাপথের দূরত্বেই ইমামবাড়া অবস্থিত। ইমামবাড়াতে ঢুকতে গেলে টিকিট কেটে ঢুকতে হয়। প্রবেশমূল্য ১০ টাকা মাত্র।
⚜️ ইমামবাড়া সম্পর্কে কিছু কথা
🔰 হুগলি ইমামবাড়া তৈরি হয়েছিল ১৮৪১ থেকে ১৮৬১ সাল দীর্ঘ ২০ বছর ধরে। তৎকালীন সময়ে তিন লক্ষ টাকা খরচ করে এই ইমামবাড়া নির্মিত হয়। ধর্মীয় রীতি, শিক্ষা, জনকল্যাণ মূলক কাজের জন্য হাজী মহম্মদ মহসিন্ জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে তার সম্পত্তিকে দেবত্বর করেছিলেন। মূলত তাঁর রেখে যাওয়া টাকা থেকেই ইমামবাড়া নির্মাণ করা হয়।
🔰 এই ইমামবাড়া মসজিদ নয়। ‘ইমামবাড়া’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ইমামের বাড়ি, কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশে ইমামবাড়া হল শিয়াপন্থীদের মিলনস্থল। এখানে বলে রাখার দরকার যে ইমামবাড়া ও মসজিদ এক জিনিস নয়। মসজিদ সাধারণত ইসলামের সমস্ত সম্প্রদায়ের কাছে উপাসনালয় যেখানে তারা দলবদ্ধভাবে নামাজ পড়তে পারেন, অন্যদিকে ইমামবাড়া শুধুমাত্র শিয়া সম্প্রদায়ের জন্য তৈরি হওয়া আনুষ্ঠানিক গৃহ যা বিশেষত মহরমের স্মৃতিরক্ষার্থে নির্মিত। কিন্তু হুগলীর এই ইমামবাড়া একদিকে মসজিদ ও অন্যদিকে ইমামবাড়া দুটি দায়িত্বই পালন করে আসছে।
🔰 ইমামবাড়া একটি পবিত্র মিলন ক্ষেত্র যেখানে ইমাম হুসেন এর আত্মবলিদানকে স্মরণ করা হয়। হযরত মহম্মদ এর নাতি ইমাম হুসেন ইরাকের কারবালা ময়দানে ইসলাম ধর্মকে রক্ষা করতে গিয়ে শহীদ হয়েছিলেন।
📛 আরও তথ্যের জন্য নীচের লিংকে ক্লিক করতে পারেন -
🔶️ হুগলির এই ইমামবাড়া গঙ্গার ধারেই অবস্থিত। ঢুকেই রয়েছে একটা বিশাল ঘড়ি। একে জোড়া ক্লক টাওয়ারও বলা হয়ে থাকে। তিনরকমের ঘন্টা আছে এখানে। যার মধ্যে দুটি ঘন্টা প্রতি পনেরো মিনিট অন্তর বাজে এবং শেষ ঘন্টাটি প্রতি এক ঘন্টা পর পর বেজে থাকে। এই ক্লক টাওয়ারে ওঠার জন্য দুদিকে সিঁড়ি রয়েছে। একদিকে পুরুষদের জন্য সিঁড়ি, অন্যদিকে মহিলাদের জন্য। মোট ১৫২টি সিঁড়ি ভেঙে যদি উপরে ওঠা যায়, তবে মনে হবে জীবন সার্থক। এক অসাধারণ দৃশ্য চোখের সামনে দেখতে পাবেন। উপরে ওঠার শেষ চারটি সিঁড়ি যথেষ্ট খাঁড়া, তাই ওই চারটে সিঁড়ি খুব সাবধানে উঠতে হবে। সামান্য অসাবধানে কিন্তু মারাত্মক বিপদ হতে পারে।
ছবি: ক্লক টাওয়ারের উপর থেকে
ছবি: ক্লক টাওয়ারের উপর থেকে
🔶️ উঠোনের মাঝখানে আছে এক বিশালাকার জলাধার। এর মাঝে একটা ফোয়ারাও রয়েছে। কিন্তু এখন আর এটি কাজ করে না। জল পরিষ্কার নয়। তবে শ্যাওলা নেই। জলাধারের চারপাশে ঘোরার জন্য রাস্তা আছে। সেই রাস্তা দিয়ে চক্কর কাটতে পারেন জলাধারটিকে। আর এই জলাধার ঘিরেই রয়েছে অসংখ্য বাতিস্তম্ভ।
🔷️ উঠোনের শেষে রয়েছে একটা বিশালাকার ভবন। এটা প্রার্থনাকক্ষ। আমরা যখন গেছিলাম, তখন প্রার্থনাকক্ষ বন্ধ ছিল। তাই ভিতরে প্রবেশ করতে পারিনি। দূর থেকে যতটা দেখলাম, অসাধারণ কারুকার্যে পরিপূর্ণ এই ভবনটি। দূর থেকে দেখা কাচের জানালা, কিংবা স্তম্ভগুলি দেখলে মনে হয় একসময় কী দুর্দান্ত জাঁকজমকপূর্ণ ছিল এই স্থান!
🔶️ এই ভবনটির পাশ দিয়ে বামদিকে একটা গলি চলে যাচ্ছে। সেখান থেকে সোজা এগিয়ে গেলে বামদিকে কেয়ারটেকারদের ঘর আর সামনে একটা খোলা দরজা পড়বে। এই দরজা পেরিয়ে কিছুটা এগোলেই একটা ঢিপির চাতালের উপর রয়েছে সূর্যঘড়ি। সূর্যঘড়ি থেকে সময় নির্ণয় করা হত। শোনা যায়, আগে এর ডায়ালটি পিতলের থাকলেও, সেটি চুরি যাওয়ায় এখনকার ডায়ালটি পরে সিমেন্ট দ্বারা নির্মাণ করা হয়েছে।
🔷️ এই জায়গা থেকে ইমামবাড়ার পিছন দিকের একটা অসাধারণ দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। সাদা ভবনটি পিছন থেকে আরও ভালো লাগে দেখতে। আর ডানদিকে রয়েছে হুগলি নদীর উপর একটা ব্রিজ। দূর থেকে এই অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন যে ঘড়ির কাটা অনেকটা ঘুরে যাবে তা ধরতেই পারবেন না। মনে হয় যেন এখানেই থেকে যাই অনন্তকাল!
📛 ইমামবাড়া থেকে বেরিয়েই বামদিকে একটু এগিয়েই পড়বে মহসিনের এর টোম্ব বা মহম্মদ মহসিনের সমাধি। সুদৃশ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর অনবদ্য কারুকার্যে নির্মিত এই সমাধিস্থান দেখার মত...
🔰 এরপর এখান থেকে একটা টোটো নিয়ে আমরা চললাম ব্যাণ্ডেল চার্চ। যার জন্য লোকে এত ব্যাণ্ডেল এর নাম করে তা একবার ঘুরে তো দেখতেই হবে। চার্চে ঢোকার আগেই আমরা সকালের জলখাবার খেয়ে নিলাম। ব্যাণ্ডেল চার্চের উল্টোদিকেই বাবা লোকনাথ কেবিন ও রেস্টুরেন্ট থেকে সকালের জলখাবার খাওয়া হল। কড়াইশুঁটির কচুরি আর ডাল। একদম গরম গরম ভাজা কচুরি আর ডাল মুখে লেগে থাকার মত। এক প্লেটে চারপিস করে দেয়। আমার অন্যান্য দুই সঙ্গী আরও দু-পিস করে নিলেন। কড়াইশুঁটির কচুরি, ডাল, আর তারসাথে কাঁচা-লঙ্কা.... একদম লা জবাব জলখাবার খেয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম চার্চের উদ্দেশ্যে। উল্লেখ্য, একপ্লেট কচুরির দাম ৫০ টাকা।
ছবি: জলখাবার আর খাবারের জায়গা
🔶️ ব্যাণ্ডেল চার্চের মধ্যে ঢুকে প্রথমেই একটা সুন্দর ডেকোরেশন করা হয়েছে। এটা মূলত বছরের এই সময় অর্থাৎ ক্রিসমাসের জন্যই করা হয়েছে। সেখান থেকে পাশ কাটিয়ে কিছুটা এগিয়েই একটা বিশাল প্যাসেজ আর সেটার পরে এক বিরাট উদ্যান। এই উদ্যানে বিভিন্ন মূর্তি রয়েছে। কিছু মূর্তি সাদা পাথরের, আর কিছু রঙিন মূর্তি রয়েছে। উদ্যানে ডেকোরেশন এর জন্য বেশ কিছু প্রতিকৃতি আছে। এগুলো এই সময়ের জন্য আলাদা করে তৈরি হয়েছে নাকি সারাবছরই থাকে সেই বিষয়টা আমার জানা নেই। আর রয়েছে মানুষদের বসার জন্য অনেক বেঞ্চ।
ছবি: ব্যাণ্ডেল চার্চ আর সামনের ডেকোরেশন
🔷️ এর পর পিছনেই মূল চার্চে ঢোকার রাস্তা। চার্চে ঢুকেই এক লম্বা 'L' আকৃতির করিডোর। করিডোরের দুই পাশে অসংখ্য ছবি। মূলত মূল্যবান কাহিনীর উপর ভিক্তি করে কিছু ছবি রয়েছে। এর উল্টোপাশের দেওয়ালে রয়েছে ইহুদিদের সম্পর্কে তথ্যনির্ভর অনেক ছবিতে লেখা কাহিনী। এখানে কোনো ছবি তোলার পারমিশন নেই। এখান থেকে আসতে হয় উঠোনের মাঝখানে। সেখানে সবাই মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করতে পারেন।
🔶️ উঠোনের মত এই জায়গা থেকে সিঁড়ি দিয়ে চার্চের উপরে ওঠার রাস্তা আছে। সেই সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে আমরা এসে পৌঁছালাম আর এক প্রার্থনা কেন্দ্রে। এখানেও নীরবতা পালন করে সবাই মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করে। সেখান থেকে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে নামতে একটা সমাধিস্থান দেখতে পাওয়া যায়। এরপর নীচে নেমে আমরা মূল হলঘরে এসে পৌঁছাই। সেখানেই রয়েছে অসংখ্য সেই কাঠের বেঞ্চ, যেখানে বসে সবাই বাইবেলের পাঠ করেন। এই কক্ষের দেওয়ালে রয়েছে বিভিন্ন ছবিতে কাহিনীর মাধ্যমে যীশুখ্রীষ্টের জীবন কাহিনী। অসাধারণ পরিবেশ, এক শান্ত নীরব বাতাস চারিদিকে। এতদিন সিনেমাতে দেখেছি চার্চের হলঘর। এই প্রথম সামনাসামনি দেখলাম। চার্চের মেরুদন্ড বলতে গেলে এই কক্ষ। তাই বিভিন্ন জায়গায় চার্চের দৃশ্য বলতে এই ঘরকেই সাধারণত তুলে ধরে। এই কক্ষ থেকে বেরিয়েই ডানদিকে ব্যাণ্ডেল চার্চ থেকে বেরোনোর রাস্তা।
🔰 ব্যাণ্ডেল চার্চের থেকে বেরিয়ে আমরা অটো ধরে চললাম হংশ্বেশ্বরী মন্দিরের উদ্দেশ্যে। হংশ্বেশ্বরী মন্দির বাঁশবেড়িয়াতে অবস্থিত। বাণ্ডেল ছাড়িয়ে কাটোয়া লাইনে পরের স্টেশন হল বাঁশবেড়িয়া। চুঁচুড়া থেকে ত্রিবেণীর যে অটোগুলো চলে, ওতে করে এই মন্দিরে যাওয়াই শ্রেয়। বড় রাস্তায় নামিয়ে দেবে, সেখান থেকে একটু হেঁটে চলে আসা যাবে। টোটো ভিতরে ঢোকার নাম করে গলা কাটা দাম নেবে। তাই এই বিষয়টা আগেভাগেই জানিয়ে রাখলাম।
🔶️ হংশ্বেশ্বরী মন্দিরের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ১৭৯৯ সালে তৎকালীন রাজা নৃসিংহদেবের হাত ধরে। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে এই মন্দির তৈরির কাজ চলেছে। দেবী হংশ্বেশ্বরী আসলে কালী ঠাকুর। বিরাট বড় চাতাল এর পরে মূল মন্দিরের গর্ভগৃহ। মোট তেরোটি দীর্ঘ মিনারের মধ্যে মূল মন্দিরটি দাঁড়িয়ে রয়েছে।
🔷️ মন্দিরে ভোগ প্রসাদের ব্যবস্থা আছে। প্রতিদিন পুজো হয়। কুপন কেটে ভোগ খাওয়ার ব্যবস্থা আছে।
⚜️ হংশ্বেশ্বরী মন্দিরের পাশেই আছে অনন্ত বাসুদেব মন্দির। এই মন্দিরের উপর ওঠা এখন বারণ আছে। কাজ চলছে সম্ভবত। টেরাকোটার এই মন্দিরের আকর্ষণ হল তার অসামান্য কাজ। সারা মন্দিরে রামায়ণ, মহাভারত এর বিভিন্ন কথা খোদাই করা আছে। মন্দিরের মূল বিগ্রহ এখনও আছে। সেটা বাইরে থেকে দেখা যায়।
🔶️ হংশ্বেশ্বরী মন্দিরের পিছন দিকে খোলা জায়গা অনেকটাই। মন্দিরের পাদদেশে বিস্তীর্ণ বসার জায়গা আছে। সেখানে আমরা তিনজন অর্থাৎ আমি, অর্ণব আর দীপ মিলে অনেকক্ষণ ধরে গল্প করে সময় কাটালাম। যেন সেই চন্দননগরের মিউজিয়াম এর কথাই আবার ফিরে আসল। এই সময়গুলোই সুখস্মৃতি হয়ে থেকে যাবে। অসাধারণ অভিজ্ঞতার সঞ্চার করে মন্দিরের থেকে বেরিয়ে পরবর্তী গন্তব্যের জন্য এগোলাম। এত সুন্দর জায়গা থেকে যেতে ইচ্ছাই করছিল না, কিন্তু সময়ের কাছে যে আমরা সকলেই আবদ্ধ !
📛 হংশ্বেশ্বরী মন্দির থেকে বেরিয়ে কিছুটা এগিয়ে অটো ধরলাম। এখানে অর্থাৎ ব্যাণ্ডেলে খাবার দোকান খুব বেশি পাই নি। তাই ওই ব্যাণ্ডেল চার্চের সামনে আবার গেলাম। ওখানেই খান তিনেক রেস্টুরেন্ট ছিল। তার মধ্যে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়লাম।
🔰 আমাদের খিদে পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু খুব বেশি কিছু খাওয়ার ইচ্ছা ছিল না কারোরই। সব জায়গাতেই বিরিয়ানি চেখে দেখি বলে এখানে একটু নতুনত্ব কিছু চেখে দেখার ইচ্ছা হল। তিনজনেই তাই নিলাম ভেজ ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন। খাবারের পরিমাণ যথাযথ আর গরম বলে বেশ ভালোই লাগছিল। তবে স্বাদ যে আহামরি কিছু তা একেবারেই নয়। ভেজ ফ্রায়েভ রাইস নেওয়া হয়েছে বলে রাইসের সাথে বিন দিয়ে দিয়েছে। ভাত একটু অন্যরকমের মানেই সেটা ভেজ ফ্রায়েভ রাইস হয়ে যায় না....
📛 চিলি চিকেন আমরা এক প্লেটই নিয়েছিলাম। এক প্লেটে ছয় পিস, প্রত্যেকের দু-পিস করে। হ্যাঁ, যারা অর্ণবকে চেনেন তারা একটু অবাক হবেনই, কেননা যে ছেলে দশ পিস এর কম খায় না, তাকে দু-পিসে আটকে দিলাম !!! বাবলু দা-ও পেলেকে এত ভালো আটকায়নি.....
🔶️ জোকস্ অ্যাপার্ট.... আসলে ব্যাণ্ডেলে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গা খুব একটা কাছে কিছুই নয়। তাই যাতায়াত খরচ কিঞ্চিত বেশি বেরিয়ে যাওয়ার দরুণ আর জলখাবারে সলিড খাওয়া আর খরচ হওয়ার দরুণ আমরা একটু অল্পের উপর দিয়েই ছাড়লাম দুপুরের ভুঁড়িভোজন।
🔷️ তবে এর মাঝেও যে আর এক গল্প আছে.... ওই দু-পিস চিকেন থেকে অর্ণব এর ভাগের চিকেন আবার কাটতে গিয়ে স্লিপ কেটে উড়ে এসে পড়ল টেবিলের তলায়। ব্যাস, একে ভাঁড়ে মা ভবানী, তার উপর আবার মাংস হাফিস! সব যেন ওকেই ছেঁকে ধরেছে এদিন... 😅
🔰 যাইহোক, খাওয়া-দাওয়ার পর উদরতৃপ্তি না হলেও, উদর পরিপূর্ণ করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।
⚜️ এবার আমরা চললাম লাহিড়ীবাবার আশ্রম, আঁধারালয়ে। আঁধারালয়, ব্যাণ্ডেলের সম্পূর্ণ অন্য প্রান্তে অবস্থিত। ব্যাণ্ডেল স্টেশন থেকে, স্টেশন রোড ধরে প্রথমে দিল্লি রোডে আসতে হবে। সেখান থেকে বাম হাতে একটা রাস্তা চলে যাচ্ছে। সেই রাস্তা ধরে ঘুরে ঘুরে এসে পৌঁছালাম লাহিড়ী বাবার আশ্রমে। ব্যাণ্ডেলের বিভিন্ন যেসব পিকনিক স্পট আছে, অনেকে পিকনিক করতে যায়, সব ওই ব্যাণ্ডেল স্টেশন রোডের দু-ধারে রয়েছে।
🔶️ আঁধারালয় সুন্দর জায়গা। অসামান্য পরিবেশ, অসংখ্য মন্দিরের সমষ্টি বলা যেতে পারে। কয়েকটা মন্দির যেমন, জগদ্ধাত্রী মন্দির, লোকনাথ মন্দির, নারায়ণ মন্দির প্রভৃতি যেন আঁধারালয়ের শোভা বৃদ্ধি করছে। আর এর সাথে বিভিন্ন ধর্মের জন্য আলাদা প্রার্থনাকক্ষ আছে। এছাড়া অসংখ্য ফুলের গাছ, চারিদিকে যেন বিভিন্ন রকমের ফুলের সমাহার।
🔷️ মূল মন্দিরে অর্ণব ঢুকলো না, তাই আমি আর দীপ গেলাম ভিতরে। মূল মন্দিরে ঢুকতে গেলে জুতো, মোজা সব খুলে রেখে খালি পায়ে যেতে হয় ভিতরে। জুতো রাখতে হলে জুতোজোড়া প্রতি ২ টাকা করে দিতে হয়। ওনারা পা ধুয়ে ভিতরে যাওয়ার সুন্দর এক ব্যবস্থা করেছেন। একটা ঢালু জায়গাতে সবসময় জল আসছে, অনেকটা ওই ফোয়ারার মতোন, সেখানে পা দিতেই হবে মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করতে হলে। সেখান থেকে মন্দিরের লম্বা প্যাসেজে উঠলে দীর্ঘ কার্পেট বিছানো আছে, যাতে পা দিয়ে কিছুটা হাটলে ওই জল এমনিই শুকিয়ে যাবে।
⚜️ মন্দিরের উঠেই লাহিড়ী বাবার মূর্তি। তাকে পাশ কাটিয়ে ডানদিক থেকে রাস্তা চলে যাচ্ছে। সেখানে পর পর বিভিন্ন ঠাকুরের ঘর। আছে গৌতম বুদ্ধের ধ্যানরত মূর্তি, আছে জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা এর একটি ঘর। এই ঘরগুলো পেরিয়ে কিছুটা এগিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে যেতে হয়। এবার এক অসাধারণ ঘরে এসে আমরা প্রবেশ করি। চারিদিকের দেওয়ালে মারাত্মক কারুকার্য করা। হাতের আঙুলগুলির বিন্যাসের বিভিন্ন নাম দিয়ে সারা ঘরে কারুকার্য করা হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণে ও রাধার কয়েকটি ছবি আছে। এক দুর্দান্ত মূর্তি আছে স্বয়ং নটরাজের। অসামান্য কারুকাজ, অসাধারণ শিল্পশৈলি। চোখ ফেরানো দায় এই মূর্তির থেকে। এরপর সিঁড়ি দিয়ে উঠে আবার বাইরে বেরিয়ে আসা।
🔶️ মূল মন্দিরের থেকে বেরিয়ে এসে এদিকে আর সেরকম কিছুই নেই। কয়েকটা দোকান দিয়েছে মেলার। যেমন, জামাকাপড়ের দোকান আছে, আবার এই শীতের জন্য স্পেশাল পিঠে-পুলীর দোকানও আছে।
ছবি: বাইরে বিভিন্ন ছোট-বড় মূর্তি বিক্রি হচ্ছে
🔷️ লাহিড়ীবাবার আশ্রম এর ওখানেই বাইরে বিস্তীর্ণ জায়গা আছে, ওখানেও লোকে পিকনিকের জন্য যায়। আমরা যখন যাই, তখন সেখানে যথারীতি অনেক দলই এসে বনভোজনে লিপ্ত হয়েছে।
📛 আশ্রমের বাইরেই আছে টোটো স্ট্যান্ড। এখান থেকে টোটো ধরে সোজা চলে এলাম ব্যাণ্ডেল স্টেশন। টোটো ভাড়া ২০ টাকা। এই প্রথম ব্যাণ্ডেলে এসে কোনও স্ট্যান্ডার্ড ভাড়ার টোটোতে উঠলাম। 😅😅
⚜️ এবার তাহলে ফিরিবার পালা.....
🔰 ব্যাণ্ডেল থেকে ট্রেনে চেপে চলে এলাম নৈহাটি। আমরা সরাসরি শিয়ালদহ আসার ট্রেনের অপেক্ষা করিনি। কেননা, একবার নৈহাটি এসে পৌঁছালে হাতে চলে আসবে অসংখ্য অপশন। নৈহাটি থেকে গেদে লোকাল ধরে আমরা যে যার গন্তব্যের দিকে যাত্রা শুরু করলাম...
📛 একটা ছোট্ট সাজেশন দিয়ে রাখি যারা এরপরে ব্যাণ্ডেল যাবেন তাদের জন্য। এই জায়গাগুলো সবই এক এক প্রান্তে অবস্থিত, তাই একটা জায়গা থেকে অন্য জায়গা যেতে একটু হিসাব করে যেতে হবে। নয়তো সময় নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
🔰 যাত্রা শুরু সবসময়ই হুগলী ঘাট থেকেই শুরু করা শ্রেয়। হুগলী ঘাট থেকে শুরু করে প্রথমে ইমামবাড়া ও মহসিনের টোম্ব দেখে নিয়ে সেখান থেকে ব্যাণ্ডেল চার্চ চলে আসতে হবে। এবার আগে লাহিড়ীবাবার আশ্রম ঘুরে তারপর হংশ্বেশ্বরী মন্দির চলে আসতে হবে। হংশ্বেশ্বরী মন্দির থেকে বাঁশবেড়িয়া স্টেশনে এসে ফেরার ট্রেন ধরতে হবে।
🔰অথবা, বাঁশবেড়িয়া থেকে হংশ্বেশ্বরী মন্দির দেখে অটো ধরে ব্যাণ্ডেল চার্চ, সেখান থেকে ইমামবাড়া দেখে চলে আসুন লাহিড়ীবাবার আশ্রম। সেখান থেকে ব্যাণ্ডেল স্টেশন যাওয়ার টোটো আছে, সেই টোটো ধরে স্টেশন চলে আসুন।
🔷️ সবমিলিয়ে বছরশেষে কাটল একটা অসাধারণ দিন। অনেকদিনের পরিকল্পনা পূর্ণতা পেল অবশেষে। বছরশেষের নতুন জায়গার বাতাস গ্রহন করে আবার নতুন করে নতুন বছরে মাঠে নেমে পড়ার পালা.... শুধু থেকে যাবে সেই অমলিন কিছু স্মৃতি আর প্রাণখোলা আড্ডা....😇😇😇
*-*-*-*-*
🔷️ ০১.০১.২০২৪
Darun
ReplyDeleteদারুন লেখা ভাই
ReplyDeleteখুব সুন্দর বর্ণনা। বেশ ভালো।
ReplyDelete