বারো মাসে তেরো পার্বণ
বারো মাসে তেরো পার্বণ
প্রদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায়
বাঙালির
বারো মাসে তেরো পার্বণ। এই প্রবাদটা শোনেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু বারো
মাসে তেরো পার্বণ কী কী সেটা কয়জন জানে!? কয়েকটা হয়তো বলতে পারবেন, কিন্তু সবকটা
বলতে পারেন হাতে গোনা কয়েকজনই। চলুন একটু খুঁজে দেখা যাক তেরো পার্বণের নামগুলি।
ছবি সৌজন্যে: গুগল
আগে
বসন্ত কাল বলতে বোঝাতো চৈত্র ও বৈশাখ মাসদুটিকে। এইকারণে প্রচলিত ছড়াগুলিতে চৈত্রমাসকে
দিয়েই গণনা শুরু হতো। এমন একটা বারো মাসে তেরো পার্বণের ছড়ার উদাহরণ পাই হরিপদ দে-এর
লেখা এক বইতে। ছড়াটি অনেকটা এরকম,
চৈত্র মাসে চড়ক পূজা গাজনে বাঁধা ভারা।
বৈশাখ মাসে দেয় সকল তুলসী গাছে ঝারা।।
জ্যৈষ্ঠ মাসে ষষ্ঠী বাঁটা জামাই আনা আনি।
আষাঢ় মাসে রথযাত্রা দড়া টানাটানি।।
শ্রাবণ মাসে ঢেলাফেলা হয় চড়চড়ী।
ভাদ্র মাসে টকপান্তা খান মনসা বুড়ি।।
আশ্বিনে অম্বিকা পূজা কাটে মোষ পাঁঠা।
কার্তিকে কালিকা পূজা, ভাই দ্বিতীয়ার ফোঁটা।।
অঘ্রানে নবান্ন নূতন ধান কেটে।
পৌষ মাসে বাউনী বাঁধা ঘরে ঘরে পিঠে।।
মাঘ মাসে শ্রীপঞ্চমী ছেলের হাতে খড়ি।
ফাল্গুন মাসে দোলযাত্রা ফাগ ছড়াছড়ি।।
এই
প্রচলিত ছড়ার মধ্য দিয়েই লোকে মনে রাখত বাঙালিদের কী কী উৎসব রয়েছে একটা বছরে। গ্রাম
বাংলার এই প্রচলিত ছড়াগুলো যেন মাটির কথা মনে করায়...
এবার
এই কবিতাটির এক একটি লাইন ধরে যদি দেখা যায় তাহলেই হয়তো আমরা সবকটা পার্বণকে খুঁজে
পেয়ে যাব।
প্রথম
লাইনে বলছে, "চৈত্র মাসে চড়ক পূজা গাজনে বাঁধা ভারা"। চৈত্রমাস দিয়ে শুরু
হচ্ছে আমাদের বছর। চৈত্রমাসে বাঙালির উৎসব হিসাবে রয়েছে চড়ক পুজো। সাধারণত ক্যালেন্ডারে
দেখা যায় চৈত্র মাসের শেষদিন চড়ক হিসাবে উল্লিখিত থাকে। এরপরের দিনেই এখন হয় নববর্ষ
বা হালখাতা। যদিও নববর্ষ কথাটি সঠিক নয়, হালখাতাই সঠিক। কিন্তু সেসব অন্য বিষয়, তাই
সেই নিয়ে এখানে কিছু বলছি না। চড়ক পুজোতে গাজন হওয়া, কিংবা জলন্ত কয়লার উপর দিয়ে
হাঁটা, পিঠে কিংবা জিভে বাণ ফোঁড়ানো এইরকম বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপ হয়ে থাকে। এখন শহরাঞ্চলে
চড়ক পুজো দেখা যায় না বললেই চলে, কিন্তু গ্রামের দিকে এখনও দেখা যায়।
দ্বিতীয়
লাইনে বলছে, "বৈশাখ মাসে দেয় সকল তুলসী গাছে ঝারা"। তুলসী দেবীকে তুষ্ট
করার মন্ত্র। আমার মতো অনেকেই মা-ঠাকুমার কাছে শুনে থাকবেন, তুলসী তুলসী বৃন্দাবণ,
তুমি তুলসী নারায়ণ, তোমার মাথায় ঢালি জল, অন্তিমকালে দিও স্থল। আমাদের অনেক বাড়িতেই
দেখা যায়, তুলসী গাছ যে টবে বা তুলসীমঞ্চে যেখানে তুলসী গাছ আছে, সেখানে একটা সরু
লাঠি গেঁথে তারসাথে ছোট মাটির ঘট বাধা হয়। সেই ঘটের তলায় একটা ছোট্ট ছিদ্র থাকে।
সেখান থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল এসে পড়ে তুলসীগাছের উপর। গৃহস্থ বধূরা সাধারণত সংসারে সুখ-শান্তি
লাভের আশা নিয়ে এই বিষয়টা করে থাকেন।
তৃতীয় লাইনে বলছে, "জ্যৈষ্ঠ মাসে ষষ্ঠী
বাঁটা জামাই আনা আনি"। এখানে বলা হয়েছে জামাই ষষ্ঠীর কথা। জ্যৈষ্ঠমাসে দুপুর
কিংবা সন্ধ্যার সময় জামাই গিয়ে হাজির হয় তার শ্বশুরবাড়ি। তালপাতার পাখা, কিংবা
গ্রীষ্মকালের ফল আম, কাঁঠাল এইসব দিয়ে জামাইকে বরণ করে নেওয়ার রীতি প্রচলিত রয়েছে।
অন্যদিকে জামাইও হাতে মিষ্টির হাঁড়ি নিয়ে দুলে দুলে তার শ্বশুরবাড়িতে যায়। আজকাল
এই মিডিয়ার অত্যধিক বাড়বাড়ন্তের যুগে অবশ্য অনেক সিনেমা কিংবা টেলিভিশন এর অভিনেতা-অভিনেত্রীদের
জামাইষষ্ঠীতে ভোজনের ছবি ছড়িয়ে পরে। অনেকেই সব বিশাল সাজগোজ করে ছবি তুলে কিংবা খাবারের
শত শত পদের রান্না করে সেসব ছবি দর্শকদের মধ্য ছড়িয়ে দেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লোক-দেখানো
বিষয় থাকে। তবুও লোক দেখিয়েই হোক বা না দেখিয়েই হোক, এই রীতি যে খুব ভালোভাবে পালিত
হয়ে আসছে আর আরও ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে সেটাই বাঙালির ক্ষেত্রে গর্ব করার মতো বিষয়।
ছবি সৌজন্যে: গুগল
চতুর্থ
লাইনে বলছে, "আষাঢ় মাসে রথযাত্রা দড়া টানাটানি"। এখানে রথযাত্রার কথা বলা
হয়েছে। রথযাত্রা আবার মূলত দুদিনের অনুষ্ঠান। একদিন সোজা রথ ও অন্যদিন উল্টোরথ। মাঝের
সাতদিন ধরেই আনন্দ উৎসব পালিত হয়ে থাকে। কিন্তু মূল উৎসব পালিত হয় সোজা রথের দিন।
এইদিন রথে করে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা মাসিরবাড়ি যান। আবার উল্টোরথের দিন, সাতদিন
পরে মাসিরবাড়ি থেকে ফিরে আসেন। পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে বিখ্যাত শ্রীরামপুরের মাহেশের
রথযাত্রা। বিশ্বে সবচেয়ে বড় রথযাত্রা হয় ওড়িশার পুরীতে। পুরীর রথযাত্রা জগৎবিখ্যাত,
সারা দেশ তথা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোক আসে এই রথযাত্রার চাক্ষুষ দর্শন করতে।
পঞ্চম
লাইনে বলছে, "শ্রাবণ মাসে ঢেলাফেলা হয় চড়চড়ী"। ঢেলা ফেলা পার্বণে সাধারণত
খই, মুড়ি দিয়ে বাদামভাজা বা ছোলা মটর খাওয়া হয়। এটা মূলত শিবের ব্রত পালনের মাস।
শিবের ব্রত পালনের মধ্য দিয়ে সংসারে সুখ সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পায় এরকম কথাই প্রচলিত আছে।
ষষ্ঠ
লাইনে বলছে, "ভাদ্র মাসে টকপান্তা খান মনসা বুড়ি"। লেখা থেকেই বোঝা যাচ্ছে
মনসা পুজোর কথাই বলা হয়েছে। মনসা পুজো করলে সাপের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। কথায়
বলে, 'দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পুষেছি'। মনসা পুজোতেও দুধ, কলা দিয়ে পুজো করা হয়। গ্রামের
দিকে কোনো স্থানে মাটি দিয়ে সাপের মূর্তি বানিয়ে মনসা পুজো করা হয়। তার উপর সাদা
কাপড় কিংবা ফুল দিয়ে চারিদিক থেকে ঘিরে ঠাকুর বানানো হয়। মনসা পুজো নিয়ে গ্রাম
বাংলার একটা বিখ্যাত গান আছে,
"জয় জয় মা মনসা জয় বিষহরি গো,
বন্দনা করি মাগো মা মনসার চরণে,
জয় জয় মা মনসা ।।"
সপ্তম
লাইনে বলছে, "আশ্বিনে অম্বিকা পূজা কাটে মোষ পাঁঠা"। অম্বিকা পুজো বলতে দুর্গা
পুজোকেই বোঝাচ্ছে। মা দুর্গার অপর একটি নাম হল অম্বিকা। অম্বিকা দেবীর অসুরবধকারী রূপ
হল দেবী দুর্গা। এই পুজোতে সাধারণত মোষ বলি দেওয়া হয়ে থাকে। যে মোষকে বলি দেওয়া
হয় তাকে বলে দেবরাপো।
অষ্টম
লাইনে আছে, "কার্তিকে কালিকা পূজা, ভাই দ্বিতীয়ার ফোঁটা"। এখানে এই লাইনে
দুটি উৎসবের কথা বলা আছে। একটা বাক্যকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমভাগে আছে কালিকা
পুজো। এখানে কালী পুজোর কথা বলা হয়েছে। কালী পুজোর জন্য বারাসাত, নৈহাটি, বেলঘড়িয়া,
মধ্যমগ্রাম প্রভৃতি জায়গা বিখ্যাত। সাধারণত সারারাতব্যাপী পুজো হয়। কালীপুজোতে দেওয়ালি
হয় সারাভারতে। আলোর উৎসবে সারা দেশ ঝলমলে হয়ে ওঠে।
বাক্যে
এর পরের অংশে আছে ভাইফোঁটার কথা। 'ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা, যমের দুয়ারে পড়ল কাটা,
যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা আর আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা।' এই মন্ত্র বলে বোনেরা তার ভাইয়ের
কপালে চন্দন অথবা ঘি এর ফোঁটা দিয়ে থাকে। ভাইকে সকল বিপদ থেকে রক্ষা করা ও ভাইবোনের
মধ্যে দৃঢ় বন্ধনের উৎসব হল এই ভাইফোঁটা।
নবম
লাইনে আছে, "অঘ্রানে নবান্ন নূতন ধান কেটে।" নবান্ন অর্থাৎ নব অন্ন। অন্ন
কথার অর্থ ভাত। নবান্ন উৎসব হয়ে থাকে অগ্রহায়ন মাসে। নতুন আমন ধানের চাল থেকে প্রথম
রান্নার উৎসব হল এই নবান্ন। এই খাবার কাককেও নিবেদন করা হয় অনেক জায়গায়। পশ্চিমবঙ্গের
বীরভূম, মুর্শিদাবাদের দিকে খুবই জনপ্রিয় উৎসব হল এই নবান্ন।
দশম
লাইনে আছে, "পৌষ মাসে বাউনী বাঁধা ঘরে ঘরে পিঠে।" বাউনি মানে হল পিঠেপুলি
উৎসব। পৌষ মাসে জনপ্রিয় উৎসব হল পৌষ পার্বণ। গুড়, সুজি, চালের গুঁড়ো দিয়ে অনেক মা-ঠাকুমারা
বিভিন্ন রকমের পিঠে বানিয়ে থাকে। পাটিসাপ্টা, দুধপুলি, পুলি-পিঠে, গোকুল-পিঠে, মালপোয়া
ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের পিঠে বানানো হয়ে থাকে। কোথাও চালের গুঁড়ো ব্যবহার হয় কোথাও
হয়না। পৌষ সংক্রান্তির দিন পিঠে-পুলির স্বাদে বাঙালির জিভে জল হল প্রতিবছরের বাধ্যতামূলক
রীতি।
ছবি সৌজন্যে: গুগল
একাদশ
লাইনে আছে, "মাঘ মাসে শ্রীপঞ্চমী ছেলের হাতে খড়ি।" মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী
তিথিতে বিদ্যার দেবী সরস্বতীর আরাধনা করা হয়ে থাকে। এইদিনে শিশুদের হাতেখড়ি উৎসব
পালিত হয় অনেক জায়গাতেই।
দ্বাদশ
বা শেষ লাইনে বলা হয়েছে, "ফাল্গুন মাসে দোলযাত্রা ফাগ ছড়াছড়ি।" ফাল্গুন
ও চৈত্র এই নিয়ে বর্তমানে বসন্তকাল। এই বসন্তকালের বসন্ত উৎসব অর্থাৎ রঙের খেলা হয়
ফাল্গুন মাসে। শ্রীকৃষ্ণের হোলি খেলার রীতি অনুযায়ী সারাদেশ মেতে ওঠে এই রঙের উৎসবে।
রঙবেরঙের আবির কিংবা রঙ দিয়ে রাঙিয়ে দেওয়া হয় প্রিয় মানুষদের। বাঙালি রীতি অনুযায়ী,
স্নান করে, গুরুজনদের পায়ে আবির দিয়ে প্রণাম জানানো হয়। গুরুজনরাও ছোটদের গালে অল্প
আবির গালে মাখিয়ে দেন।
এই
হল প্রতিটি লাইনের মধ্য লুকোনো এক একটি পার্বণের কথা। তাহলে যদি তালিকা করা হয় মোট
তেরোটি পার্বণের তাহলে পাওয়া যায়,
Ø চড়ক পুজো
Ø তুলসীগাছ ঝারা
Ø জামাই ষষ্ঠী
Ø রথযাত্রা
Ø শিব পুজো
Ø মনসা পুজো
Ø দুর্গাপুজো
Ø কালী পুজো
Ø ভাইফোঁটা
Ø নবান্ন
Ø পৌষ পার্বণ
Ø সরস্বতী পুজো
Ø দোলযাত্রা
এই
হল মোট হিসাব। এইভাবে মনে রাখলে সকলেই মনে রাখতে পারবেন আমাদের তেরোটা উৎসব কী কী।
শুধু প্রবাদ বাক্য নয়, বাক্যের অন্তর্নিহিত তথ্যটাও জেনে রাখা ভালো।
রেফারেন্স
Ø সেকালের কলিকাতার
দুর্গোৎসব - হরিপদ দে (আখরকথা প্রকাশনী)
*-*-*-*-*

Comments
Post a Comment