Dawshom Awbotaar (দশম অবতার)
সিনেমা : দশম অবতার
পরিচালনা : সৃজিত মুখার্জী
অভিনয়ে : প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জী, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, যীশু সেনগুপ্ত, জয়া আহসান, রাজেশ শর্মা, রজত গাঙ্গুলী
সঙ্গীত : অনুপম রায়, রূপম ইসলাম
🔰 এবার পুজোয় রিলিজ করেছে সৃজিত মুখার্জী পরিচালিত চলচ্চিত্র 'দশম অবতার'। এই সিনেমা 'বাইশে শ্রাবণ' ও 'ভিঞ্চি দা' নামক চলচ্চিত্রদুটির প্রিকোয়েল। তবে একটা কথা বলে রাখাই ভালো, এই সিনেমা দেখতে গেলে আগের দুটো দেখতেই হবে এরকম কোনও মানে নেই, কিন্তু চরিত্রগুলি সম্পর্কে আগের পরিচয়টা পেয়ে অবশ্যই থাকবেন, যেটা রিলেট করতে অনুঘটকের কাজ করবে।
ছবি : 'দশম অবতার' পোস্টার
🔶️ 'দশম অবতার' নামেই বুঝতে পারছেন যে এখানে বিষ্ণুর দশটি অবতারের কথা বলা হয়েছে। এই বিষয়গুলো অনেকেই জানেন না। সিনেমাতে কোন যুগে কোন অবতারের অবতারণা, সেই নিয়ে তথ্য দেওয়া আছে। এর সাথে হিন্দুদের তেত্রিশ কোটি দেবতারও হদিশ পেয়ে যাবেন দর্শকরা।
📛 বিষ্ণুর দশটা অবতার কী কী ?
⚜️ মৎস, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, পরশুরাম, রাম, কৃষ্ণ, বুদ্ধ, কল্কি। অনেক জায়গায় বুদ্ধের বদলে বলরামকে রাখা হয় নবম অবতারের স্থানে।
🔰 কলকাতার বুকে হঠাৎ করেই খুন হয় এক ব্যক্তি। খুন মানে নৃশংস হত্যাকাণ্ড। ঘটনার তদন্তে আসে পুলিশ অফিসার প্রবীর রায়চৌধুরী। ঘটনাস্থলে এমন এক জিনিস পান যেটাতে তার মনে সন্দেহের অবকাশ ঘটে। এর প্রায় মাসখানেক বাদে আর একটি খুন এবং একই রকমের ক্লু খুঁজে পান প্রবীর। এই হল গল্পের শুরু, এবং এখান থেকে অবশেষে আসল খুনির উদ্দেশ্যে তদন্ত করা, তাকে ধরার চেষ্টা করা এই হল মূল গল্প।
🔷️ প্রবীরের সঙ্গে যুক্ত হন ইন্সপেক্টর বিজয় পোদ্দার। তাদের দলই এই সিরিয়াল কিলিং এর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে।
🔰 তবে সৃজিতবাবু ওই সন্দীপ রায় মার্কা কাজটা না করলেই পারতেন। সিনেমার শুরুতেই খুনীকে দেখিয়ে দেওয়া আর তার পিছনে গোয়েন্দা ধাওয়া করে তাকে ধরবে, এটাই সন্দীপ রায় ম্যাজিক। এখানে সৃজিত সেটাই করলেন। প্রথমেই কিলার যীশুকে দর্শকদের দেখিয়ে দিলেন আর তারপরে তাকে কীভাবে ধরার চেষ্টা করে প্রবীর-পোদ্দার জুটি সেটাই টেনে নিয়ে চললেন পুরো সিনেমা জুড়ে।
🔶️ এই সিনেমার একটা স্তম্ভ হল দুজনের অভিনয়। প্রবীর রায়চৌধুরী চরিত্রে প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জী, আর বিজয় পোদ্দার চরিত্রে অনির্বাণ ভট্টাচার্য। প্রবীর রায়চৌধুরী এই সব সিনেমাতে দ্বিতীয়ার্ধেই খেলে নাকি!? এর আগে বাইশে শ্রাবণ হোক বা এই দশম অবতার, ইন্টারভালের পর আলাদাই অভিনয় করলেন প্রসেনজিৎ। একটা দৃশ্য আছে প্রবীরের ঘরে প্রবীর আর পোদ্দার এর কথোপকথন। ওইখানে যা কাজ করলেন, এককথায় অনবদ্য। এখানেই বোঝা যায় লোকটার অভিনয় কোন লেভেলের!
🔷️ অন্যদিকে বিজয় পোদ্দার, সরি ইন্সপেক্টর বিজয় পোদ্দার চরিত্রে অনির্বাণের এনট্রি তুখোড়। প্রবীরকে আলাদা লেভেলে তুলতে গিয়ে পোদ্দারকে মাঝেমধ্যে একটু হাসির খোরাক করার চেষ্টা করেছেন পরিচালক মহাশয়, তবে সেই সবকিছুতেই অসামান্য কাজ করেছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য। ডায়লগ থ্রো থেকে শুরু করে হাটাচলা, তাকানো, অভিনয় সবকিছুই দুর্দান্ত অনির্বাণের।
🔶️ এই সিনেমাতে সিরিয়াল কিলারের ভূমিকায় আছেন যীশু সেনগুপ্ত। যীশু সেনগুপ্ত একজন সলিড অভিনেতা। এখানে ভিলেনের ভূমিকায় রয়েছেন এবং ভিলেন হিসাবেও যে কতটা নিখুঁত অভিনয় করা যায় সেটাই দেখালেন। কিন্তু আমি হতাশ। কারণ যীশুকে সেরকম ব্যবহারই করতে পারেনি পরিচালক। প্রবীর-পোদ্দারকে আলাদা করে তুলতে গিয়ে যীশু কোথাও গিয়ে আন্ডারইউজড হয়ে গিয়েছে। একটা সিরিয়াল কিলিং এর গল্পে সাধারণত কিলার যে হয় তার মনস্তাত্ত্বিক গল্পই প্রধান থাকে। কিলার কিলিং আর্ট নিয়ে আলাদা ভাবে একটা স্পেস থাকে। যেটা এখানে একদম পাওয়া গেল না। যীশুকে সেইভাবে ব্যবহার করলে ফাটাফাটি হয়ে যেত।
🔷️ সিনেমাতে আর একটা বড় চরিত্র হল জয়া আহসান। ট্রেলারে দর্শক ইতিমধ্যেই দেখে নিয়েছেন তার সাথে বিজয় পোদ্দারের একটা ভালোবাসার গল্প আছে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে জয়া আহসানের কাজ একদমই মনে ধরেনি। এন্ট্রির সময় একদমই ঝুল, আর অভিনয়ের অনেক জায়গাতেই ফ্লপ লেগেছে। তার মেক আপটাও সবসময় ঠিকঠাক লাগেনি।
🔰 কিন্তু এই এতসবকিছু দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা দুর্বল চিত্রনাট্যের উপর বেস করে। সিরিয়াল কিলিং এর যে একটা আলাদা আমেজ থাকে, যেটা বাইশে শ্রাবণ দেখিয়েছে বা ভিঞ্চি দা দেখিয়েছে সেটাই তো নেই! রহস্য জমাতেই দিচ্ছেন না, প্রবীর বাবু (সরি, বাবু নয় স্যার হবে) তার আলট্রা পাওয়ার দিয়ে ধরেই নিচ্ছেন। অপরাধীকে বড় জোর করে তুললেই তো হবে না! তাকেও তো সুযোগটা দিতে হবে নিজের কাজ দেখানোর! সেটাই তো মিস করলাম।
📛 এই সিনেমার দুটো দুর্দান্ত পজিটিভ জিনিস আছে। প্রথমটি হল ডায়লগ। এর আগের দুটো সিনেমার এসেন্স বজায় রাখার জন্য কিছু ডায়লগের ছোঁয়া পরিচালক মহাশয় আবার রেখে গেছেন। সেই ফিলিংসটা যাতে আসে। আর সেগুলো সেই একই ছোঁয়ায় বলে গেলেন অভিনেতারা। এই জিনিসগুলোতে যে হল ফাটানো চিৎকার শোনা গেল, তাতেই বোঝা যায় মানুষের কাছে এই ডায়লগগুলোর কী ভূমিকা!
⚜️ দ্বিতীয় যে জিনিসটার কথা বলব সেটা হল গান। ব্যাক করেছেন অনুপম রায়। অনুপম আর রূপমের জুটি ফাটিয়ে দিয়েছে। গানের কথাগুলো যেমন ভালো, তেমনি তাদের সঠিক জায়গায় ব্যবহার, সেইগুলোও যথেষ্ট প্রশংসার যোগ্য।
🔷️ দু-একটা জায়গায় ভিএফএক্স খুবই খারাপ। শেষ দৃশ্যে একটা এরকম কাজ আছে। দেখে হেসেই ফেললাম। একটু বাস্তবসম্মত তো করো! হাওয়ায় সাঁতার কাটা যায় না... 😉
⚜️ দর্শকদের জন্য আরও দুটো ভালো খবর আছে। প্রথমটা হল এই সিনেমাতে কিন্তু খোকাও ফিরেছে। কখন, কোথায় সেটা বলব না, খুঁজে নিতে হবে। আর অন্যটা হল এই সিনেমার পরের পর্ব আসবে। সিনেমার শেষে পরিচালক মহাশয় হিন্ট দিয়েছেন।
📛 পরিশেষে এটাই বলার যে, এত কম সময়ে আজকাল যেভাবে সিনেমা নামাচ্ছেন পরিচালকরা, সেটা যথেষ্টই চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই সিনেমাটাই যদি আরও সময় নিয়ে গোছাতেন, ভাবতেন হয়তো আরও একটা 'বাইশে শ্রাবণ' হয়ে থাকতে পারত! শুধু হল ভরিয়ে পয়সা তুলে কী লাভ, যদি না মনে গেঁথে থাকে। লোকে এখনও 'বাইশে শ্রাবণ'-এর নাম করে, 'দশম অবতার'-এর নাম করবে তো!?
🔷️ ২২.১০.২০২৩
Comments
Post a Comment