কালের মন্দিরা | শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
উপন্যাস : কালের মন্দিরা
বইয়ের নাম : শরদিন্দু অমনিবাস (তৃতীয় খণ্ড)
লেখক : শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রকাশনী : আনন্দ পাবলিশার্স
মুদ্রিত মূল্য : ৪০০/- (বর্তমানে পরিবর্তনসাপেক্ষ)
📌 বাংলায় ঐতিহাসিক কাহিনী লেখকদের মধ্যে শরদিন্দুবাবুর নাম একদম প্রথমেই বলা চলে। তার ঐতিহাসিক কাহিনীগুলি নিয়ে নিজস্ব বক্তব্য ছিল যে, এই কাহিনীগুলি সবই ইতিহাস আশ্রিত কাহিনী (উপন্যাস), অর্থাৎ হিস্টোরিক্যাল ফিকশন। লেখকের কালের মন্দিরা উপন্যাসটি এরকমই একটি ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস।
🔱 কালের মন্দিরা উপন্যাসটি প্রাচীন ভারতে গুপ্ত সাম্রাজ্যের আমলে দুর্ধর্ষ হুণ আক্রমণকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে। ছোটবেলায় ইতিহাসে একটি প্রশ্ন সাধারণত আসত যে, কোন সম্রাট হুন আক্রমণ প্রতিরোধ করেন!? এর উত্তর হলো - গুপ্ত সম্রাট প্রথম কুমারগুপ্তের পুত্র স্কন্দগুপ্ত। স্কন্দগুপ্ত নিজের শাসনকালের প্রথম পর্বে হুন আক্রমণ প্রতিরোধ করেছিলেন। তিনি এক দুর্ধর্ষ যোদ্ধা ছিলেন; শাসনকালের অধিকাংশ সময়ই বৃহৎ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন বিদ্রোহ দমন কিংবা বড়ো বড়ো যুদ্ধ করেই কেটে গেছে। তার শাসনকালের শেষ পর্বে পুনরায় হুণ সম্প্রদায় আক্রমণ করে। এই কাহিনী বলা যেতে পারে হুণ আক্রমণের প্রথম পর্ব থেকে স্কন্দগুপ্তের রাজত্বের শেষ পর্যায়ের হুণ আক্রমণ পর্যন্ত বিস্তৃত।
📛 ️উপন্যাসটির বিভিন্ন ঘটনাগুলোকে পরপর সাজালে যে প্রকৃত চিত্রটি ফুটে ওঠে তা নিয়ে আলোচনা করলে প্রথমেই দেখা যায় গুপ্তসাম্রাজ্যের কোনো এক প্রদেশ বিটঙ্ক রাজ্যে হুণরা আক্রমণ করে সেখানকার রাজাকে হত্যা করে। রাজপুত্রকে নিয়ে কয়েকজন হুণ এক দুর্ধর্ষ ক্রীড়া করে। কিন্তু সেই রাজপুত্রর শেষ পর্যন্ত কি হল তা পরে আর জানা যায় না। অন্যদিকে রাজপুত্রের যে ধাত্রীমাতা তাকে কোনো এক হুণযোদ্ধা ধরে নিয়ে চলে যায়। তারও কোনো খবর পরবর্তীকালে পাওয়া যায় না। উপন্যাসটি শুরুই হচ্ছে সেই ধাত্রীমাতার কন্যা (সুগোপা) এর সাথে সেই হুণ আক্রমণের সময়কার এক হুণ যোদ্ধার কথোপকথন দিয়ে।
🔶 ️ এই কথোপকথনের মধ্যেই প্রবেশ করেন উপন্যাসের অন্যতম মুখ্য চরিত্র চিত্রক বর্মা। চিত্রক বর্মা দুর্ধর্ষ যোদ্ধা, ধুরন্ধর বুদ্ধিমান, ঘোড়া চালানোয় পারদর্শী বহুগুণসম্পন্ন এক ব্যক্তি, যুদ্ধ যার অত্যন্ত প্রিয়। ঘটনাচক্রে একটি ঘোড়া চুরি করেন তিনি এবং সেই কারণেই বন্দি হয় বিটঙ্ক রাজ্যের বন্দিশালায়। কিন্তু শেষপর্যন্ত অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সহিত সে বন্দিদশা থেকে মুক্তি লাভ করে।
👉 অন্যদিকে, কাহিনীর আরেক মুখ্য চরিত্র রট্টা যশোধরা, বিটঙ্ক প্রদেশের রাজদুহিতারই ছিল সেই ঘোড়া। সেই সুত্রেই প্রথম সামনাসামনি আসেন উপন্যাসের মুখ্য দুই চরিত্র। এরপর বিভিন্ন ঘটনাক্রমে ক্রমশ তাদের মাঝের দুরত্ব কমতে থাকে। কিন্তু কীভাবে শেষ হয় তাদের এই সম্পর্ক!? সেটার জন্য উপন্যাসের শেষ পাতা পর্যন্ত পৌঁছোতে হবে।
🔸️🔹️ এবার কাহিনীতে স্কন্দগুপ্তের প্রবেশের কারণ সম্পর্কে আলোকপাত করা যাক। দীর্ঘদিন ধরে সম্রাট স্কন্দগুপ্তকে রাজস্ব প্রদান করা থেকে বঞ্চিত করে এসেছে বিটঙ্ক রাজ্য। আবার হুণ সম্প্রদায় পুনরায় গুপ্ত সাম্রাজ্যেকে আক্রমণ করার পরিকল্পনা করছে। তাই বাধ্যহয়েই স্কন্দগুপ্তকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে হুণ আক্রমণ দমনে বেরোতে হয় এবং বিটঙ্ক রাজ্যের সাথেও তার এক রাজস্ব সম্পর্কিত বোঝাপরা বাকি। ঘটনাচক্রে তিনিও ওই দুই যুবক যুবতীর মাঝে জড়িয়ে পড়েন এবং শেষপর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
🔶 ️ চিত্রক বর্মার প্রকৃত পরিচয় কী আর কীভাবেই বা শেষ পর্যন্ত সে তার প্রকৃত অধিকার পুনরুদ্ধার করল তারই বর্ণনা করেছেন লেখক এই উপন্যাসে। শরদিন্দুবাবু কেন দুর্দান্ত লেখক তার দৃষ্টান্ত তিনি তুলে ধরেছেন প্রতি পাতাতেই। পড়তে পড়তে কখনোই বিরক্তিবোধ আসবেনা। সব সময়ই এক উৎকণ্ঠা তৈরি হবে যে এর পরে কি ঘটলো, কিভাবে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার পরিসমাপ্তি ঘটল এবং কাহিনীর শেষে কী হল।
👉 উপন্যাসের শুরুতেই লেখক বলেছেন, "বারাে বৎসরের ব্যবধানে মানুষের মন এক প্রকার থাকে না ; চরিত্র দৃষ্টিভঙ্গি রসবােধ সবই বদলাইয়া যাইতে পারে, সৃষ্টিশক্তিরও তারতম্য ঘটা সম্ভব। গল্পের যে স্থানটিতে বারাে বছরের ফাঁক পড়িয়াছে পাঠক-পাঠিকা হয়তাে সহজেই তাহা ধরিয়া ফেলিতে পারিবেন। যদি না পারেন, বুঝিব আমার অন্তলোকে মহাকালের মন্দিরা এখনও একই ছন্দে বাজিতেছে, তাহার তাল কাটে নাই।" - বাস্তবেই আমি অন্তত কোনো পার্থক্য বুঝিনি। কারণটা লেখক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় বলেই হয়তো।🙂 অর্থাৎ, লেখকের অন্তলোকে যে মহাকালের মন্দিরা বেজে চলেছে, তাহার তাল এখনও কাটেনি, এখনও নাহ্। যেমন দুর্ধর্ষ লেখনশৈলী, তেমনি অসাধারণ উপন্যাসের প্লট - শরদিন্দুবাবুর এই মনমুগ্ধকর উপন্যাস একবার নয়, বারংবার অবশ্যপাঠ্য।।
©️ প্রদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায়
#প্রদীপ্তের_প্রতিক্রিয়া
১৭/০৯/২০২১

Comments
Post a Comment