ফ্রেডরিক্স নগরে একদিন.....❣ (Serampore)
ফ্রেডরিক্স নগর হল শ্রীরামপুরের আদি নাম। গঙ্গার পাশে অবস্থিত শ্রীরামপুর শহর তার অনন্য ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। অনেকদিন ধরেই যাব যাব করেও যাওয়া হয়ে উঠছিল না। শেষে এমন একদিনে আমরা শ্রীরামপুরে গেলাম সেদিন আবহাওয়ার অবস্থা বড্ড খারাপ। প্রচণ্ড দাবদাহ আর তারসাথে কিছু রাজনৈতিক দলের কার্যকলাপের পরিকল্পনা। যদিও দ্বিতীয়টির কিছুই সেরকম আমরা শ্রীরামপুরে টের পাইনি (যা কিছু হওয়ার আগের স্টেশন রিষড়াতে হয়েছে), তবে প্রথমটি অর্থাৎ প্রচণ্ড রোদ আমাদের চলার পথে যথেষ্ট বাধার সৃষ্টি করতে উদ্যত ছিল।
এই বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করেও আমরা এগিয়ে চলেছি, ঘুরেছি শ্রীরামপুরের কিছু ঐতিহাসিক স্থান। কীভাবে শুরু করলে শ্রীরামপুরের প্রায় সব জায়গাগুলোই দেখা যাবে তার একটা তালিকা আমি শেষে করে দিয়েছি। সেটি দেখলে ভবিষ্যতে কারোর যাওয়ার ইচ্ছা থাকলে, সহজেই সে যেতে পারবে। এবার আসা যাক আমাদের ভ্রমণ বৃত্তান্ততে।
ছবির সৌজন্যে : Indian Vagabond
🔰 আমরা চারজন গেছিলাম। আমি ছাড়া শান্তুনু, দীপ এবং সৈকত। সকালেই শান্তনু আর দীপ যাদবপুর থেকে চলে এল বেলঘড়িয়া। আমরা এখান থেকে প্রথমে সোদপুর গেলাম আর তারপর অটোটে করে পানিহাটি ঘাট। সেখান থেকে লঞ্চে গঙ্গা পার হয়ে ওপারে কোন্নগর ঘাট ও তারপর টোটোতে কোন্নগর স্টেশন। এরপর ট্রেনে চেপে একটা স্টেশন পরেই সেই কাঙ্খিত শ্রীরামপুর।
ছবি : লঞ্চে করে গঙ্গার উপর দিয়ে যাত্রা শুরু
🔵 আমাদের যাত্রার পাশাপাশি শ্রীরামপুরের ইতিহাস নিয়েও কিছু কথা বলে যাই।
⛔ মোহনপুর, শ্রীপুর এবং গোপিনাথপুর এই তিনটি গ্রামকে নিয়ে ডেনিশরা তৈরি করেন এক ডেনিশ কলোনি। এর নাম দেওয়া হয় ফ্রেডরিক্স নগর। ডেনমার্কের রাজা পঞ্চম ফ্রেডরিক্সের নামানুসারে এই নামকরণ করা হয়েছিল। ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি এই ফ্রেডরিক্স নগর কিনে নেয়। এর নতুন নাম হয় শ্রীরামপুর। এশিয়ার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়, ভারতের দ্বিতীয় কলেজ, ভারতের প্রথম গ্রন্থাগার এই শ্রীরামপুরেই স্থাপিত হয়েছিল।
🔰 আমরা প্রথমে এসে পৌঁছালাম শ্রীরামপুর রাজবাড়ি। একে চাতরা রাজবাড়িও বলে। বাড়ির গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে প্রথমেই এক নাটমন্দির এসে দাঁড়াতে হয়। ওখানকার দারোয়ান এর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য আর পূর্বের পড়াশোনা থেকে এটা জানতে পারি যে ওই স্থানে আগে কোনো নাটমন্দির ছিল না। ওখানে আগে ছিল এক সুবিশাল চৌবাচ্চা। একদিন রাজার এক বছর পাঁচেকের সন্তান ওই চৌবাচ্চার জলে ডুবে যায়, ফলতঃ রাজামশাই ওই চৌবাচ্চা বন্ধ করে দেন। গড়ে তোলেন বিশাল থামওয়ালা এই নাটমন্দির। এর পাশেই সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলে প্রথমে আসে দুর্গামণ্ডপ। এখন দরজা বন্ধ করে রাখা আছে। দুর্গাপুজোর সময় খোলা হবে। এরপর বাঁদিকে কিছুটা এগিয়ে একদম শেষপ্রান্তে আছে রাধা-কৃষ্ণ এর বিগ্রহ। রাধার বিগ্রহটি অষ্টধাতু নির্মিত এবং কৃষ্ণের বিগ্রহটি নির্মিত হয়েছে কষ্টিপাথরে। দরজা বন্ধ থাকলেও ফাঁকা দিয়ে পরিস্কার ভাবে দেখা যায় তাদের। উল্টোদিকে শেষপ্রান্তে আছে উপরে ওঠার সিঁড়ি। উপরে এখন শুনলাম নাকি স্কুল চালু করা আছে। অনেকে দূর থেকে আসে, তারপর একেবারে অপেক্ষা করে ছেলে-মেয়েকে নিয়ে একেবারে বাড়ি ফেরে। এই বাড়িতে হয়েছে বিখ্যাত বাংলা সিনেমা 'ভূতের ভবিষ্যতে'র শ্যুটিং। উপরের এই অংশটা মেরামত করে দিয়েছিল ফিল্ম এর লোকেরাই। যেহেতু সেখানে ক্লাস চালু আছে, তাই সেইদিকে আমরা যেতে পারলাম না। ক্লাস শেষ হয় বিকাল তিনটের সময়। দোতলাতে ওই অংশের উল্টোদিকের অংশ এখনও মেরামত করা হয়নি। একতলাতে নাটমন্দিরের পাশে মূল বাড়িতে ওঠার জায়গাতেই রয়েছে অসংখ্য আলোকসজ্জা। এই তীব্র গরমে নাটমন্দিরের মাথার ছাদ যেন সুবিশাল ছায়ার বিস্তার করেছে। আর নাটমন্দির অংশটা ঠাণ্ডা, হয়তো নীচে চৌবাচ্চা আছে বলেই। রাজবাড়ির বর্তমান বংশধররা কেউ এখানে থাকেন না। সবাই বাইরে থাকে, কেউ কেউ থাকেন আমেরিকাতে। তবে দুর্গাপুজোর সময় চলে আসেন সবাই। এখনও ধুমধাম করে দুর্গাপুজো হয়। সবাই সবকিছু মিটিয়ে একেবারে ভাইফোঁটার পরে আবার ফিরে যান। প্রতিবছর এইসময় রাজবাড়ি এক নতুন উদ্যমে জেগে ওঠে। আলো ঝলমল করে ওঠে আশেপাশের পরিবেশ।
ছবি : রাজবাড়ির রাধা-কৃষ্ণ
![]() |
ছবি : রাজবাড়ির নাটমন্দির |
![]() |
ছবি : নাটমন্দিরে আমরা চারজন |
🔰 এরপর আমরা এসে পৌঁছালাম বিখ্যাত 'ডেনমার্ক ট্যাভার্ন'। ডেনমার্ক ট্যাভার্ন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে। নিশান ঘাটের পাশেই গড়ে ওঠা এই বাড়িটি ছিল মূলত এক সরাইখানা। পাশেই হুগলী নদী; এই নদী পথে বানিজ্য করতে আসা ইউরোপীয় নাবিকরা আশ্রয় নিত এখানে। এখানে ব্যবস্থা ছিল জলখাবার, লাঞ্চ, রাতের খাবার এমনকি বিভিন্ন রকমের পানীয়ের। এছাড়া পথে ক্লান্ত নাবিকরা এইখানে এসে বিশ্রাম নিয়ে আবার পরের দিন যাত্রা শুরু করত। এই বাড়িতে ছিল একটা সুবিশাল বিলিয়ার্ডস্ টেবিল। কালের নিয়মে ধ্বংস হয়ে যায় এই সুপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ডেনমার্ক ট্যাভার্ন। কেবল অবশিষ্ট ছিল সামনের দুটি বিশালাকার পিলার। এখন নতুন করে আবার মেরামত করা হয়েছে এই বাড়িটি। আবার আগের মতোই এখানে পাওয়া যায় বিভিন্ন রকমের খাবার। আছে দার্জিলিং-এর চা, কিংবা ভারতীয় বিভিন্ন রান্না। ড্যানিশ স্পেশাল কিছু খাবারও পাওয়া যায় এখানে। ভিতরে থাকার জন্য ঘর ভাড়া করার সুযোগও আছে। সকল জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত দাঁড় বর্তমানের এই ডেনমার্ক ট্যাভার্ন। এই সংরক্ষণের মাধ্যমেই ডেনমার্ক ট্যাভার্ন এখনও অটুট রেখে চলেছে তার ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস।
![]() |
ছবি : ডেনমার্ক ট্যাভার্ন |
ছবি : শহিদ স্তম্ভ (নিশান ঘাটের পাশে) ![]() |
ছবি : ডেনমার্ক ট্যাভার্ন |
🔰 ট্যাভার্ন দেখার পর নিশান ঘাটে কিছু সময় কাটিয়ে আমরা এসে পৌঁছালাম ডেনিশ গভর্নমেন্ট হাউস। ১৭৭১ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় এই বিল্ডিংটি। এর আগে গভর্নমেন্ট হাউস (অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ বিল্ডিং) হিসাবে একটি মাটির বাড়ি ছিল। সেটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর এই বাড়িটি তৈরি হয়। বর্তমানে এটি মিউজিয়াম নামেও পরিচিত। এখানে রয়েছে ৪০টিরও বেশি ভাষায় অনুদিত বাইবেল। একাধিক পোস্টার ও ম্যাপের সাহায্যে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে শ্রীরামপুরের ইতিহাস। শ্রীরামপুরের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের বর্ণনাও করা হয়েছে। এখানে রয়েছে সেইসময় ব্যবহৃত বন্দুক এছাড়াও রয়েছে রাজমিস্ত্রিদের ব্যবহার করা বিভিন্ন সরঞ্জাম। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের অন্তর্গত এই ডেনিশ গভর্নমেন্ট হাউস। বিশালাকার মাঠের চারদিক উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। বর্তমানে উত্তরদিকের গেটটি নতুনভাবে তৈরি করা হয়েছে। পিছনদিকের গেটের পাশে এই গভর্নমেন্ট হাউসের কমপ্লেক্সের অন্তর্গত একটি বিল্ডিংকে নতুনভাবে সংস্কার করে তৈরি করা হয়েছে একটি ঐতিহ্যবাহী ক্যান্টিন, 'ভেতো'। ভেতোতে সাধারণ মানুষ এসে ট্রাডিশনাল সব খাবার পাবে। রেস্তোরাটির ভিতরে সাজানো হয়েছে বিভিন্ন প্রাচীন দ্রব্যাদি সহযোগে। বাইরে ঘুরে এসে এখানে এসে পর্যটকরা পাবেন একটা হেরিটেজ আমেজ।
🔷️ একটি লিংক দিলাম, যেখানে ছবি সহযোগে 'ডেনিশ গভর্নমেন্ট হাউস' ও 'ভেতো' সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আছে.....
![]() |
ছবি : মিউজিয়ামের মধ্যে একটি পোস্টারে চিত্রের নমুনা |
🔰 এরপর আমরা এসে পৌঁছালাম সেন্ট অলেভ চার্চে। চার্চের গেট বন্ধ থাকার দরুণ ভিতরে প্রবেশ করতে পারিনি। তাই বাইরে থেকেই দেখে ছবি তুলে চলে আসতে হল। এই চার্চটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮০৬ খ্রিস্টাব্দে। কিন্তু ২০০৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সগৌরবে এগোনোর পরে চার্চটি বন্ধ হয়ে যায়। তারপর সংস্কারের কাজ শুরু হয় এবং ২০১৬ সালে পুনরায় জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ইউরোপীয় ও ভারতীয় সংস্কৃতির মিশেলে তৈরি হওয়া এই চার্চটি এতটাই দীর্ঘ যে হুগলী নদীতে জলবিহারে গেলেও চার্চটি সেখান থেকে দেখা যায়। চার্চের উল্টোদিকে একটি ছোট পার্ক আছে যেখানে এখনও রয়েছে বেশ কিছু কামান।
🔰 চার্চ দেখার পর আমরা গঙ্গার ধার বরাবর যে রাস্তা চলেছে তাই বরাবর হাটতে লাগলাম। বেশ কিছুটা হাটার পর আমরা এসে পৌঁছাই শ্রীরামপুরের 'জুট মিল'-এ। আমরা ভিতরে ঢুকিনি। বাইরে থেকে দেখে আবার সামনে এগিয়ে গেছি।
🔰 এরপর কিছুটা এগোলেই পরবে শ্রীরামপুরের ব্যাপ্টিস্ট চার্চ। এটিও বন্ধ থাকার দরুণ ভিতরে যেতে পারিনি। বাইরে থেকে দেখে চলে আসতে হল। তবে এই এলাকার পরিবেশ বেশ ভালো লাগল। গাছপালা ঘেরা, নদীর ধারে ঠাণ্ডা মনোরম পরিবেশে চার্চ।
ছবি : ব্যাপ্টিস্ট মিশন চার্চ
🔰 আরও সামনের এগোলে কলেজ। শ্রীরামপুর কলেজ। প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে, হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হবার ঠিক পরের বছর। কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন উইলিয়াম কেরি সহ সেকালের আরও সমাজের বিশিষ্ট কয়েকজন মিলে। এই কলেজের মধ্যে আছে উইলিয়াম কেরি সংগ্রহশালা। কলেজের মধ্য দিয়েই যাওয়া যায় ব্যাপ্টিস্ট মিশন প্রেসে। এই প্রেসেই পঞ্চানন কর্মকার জন্ম দেয় বাংলা হরফের (১৭৯৯)। এইখানে বাংলার প্রথম সংবাদপত্র 'সমাচার দর্পন' ও প্রথম বাংলা গ্রন্থ 'রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র' এখান থেকেই প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে রয়েছে একটি বোটানিক্যাল গার্ডেন যেটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন স্বয়ং উইলিয়াম কেরি।
🔷️ উইলিয়াম কেরি সংগ্রহশালাতে কী কী দ্রব্যাদি আছে সেই সম্পর্কে একটি লিংক দিলাম....
👉 https://www.wmcarey.edu/carey/legacy/virtual-serampore/Serampore%20html/museumpix.html
⛔ এরপর এখানের আশেপাশের আরও কিছু জায়গায় যাওয়ার কথা থাকলেও প্রচণ্ড রোদ আর রাজনৈতিক গণ্ডগোলের আশঙ্কায় আমরা আর এগোয়নি। একটা টোটো নিয়ে একটি রেস্টুরেন্টে খেতে যাই ও তারপর সেখান থেকে মাহেশে চলে যাই। খাওয়া-দাওয়ার প্রসঙ্গে পরে আসছি, এরপর মাহেশের কথা বলা যাক।
🔰 শ্রীরামপুরের বিখ্যাত আকর্ষণ হল মাহেশ এর জগন্নাথ মন্দির। রথের সময় এখানকার ভিড় উপচে পরে। ১৩৯৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে এই রথযাত্রা হয়ে চলেছে। এই রথটির উচ্চতা ৪৫ ফুট। ১২৫ টন ওজনের লোহার তৈরি ১২ চাকার চারতলা এই রথের সামনে রয়েছে তামার তৈরি দুটি ঘোড়া ও দুটি রাজহংস।
প্রথম তলাতে রয়েছে চৈতন্য লীলা ; দ্বিতীয় তলাতে রয়েছে কৃষ্ণ লীলা ; তৃতীয় তলাতে রয়েছে রাম লীলা ; চতুর্থ তলাতে রয়েছে জগন্নাথ দেবের আসন।
![]() |
ছবি : মাহেশের রথ |
🔰 শ্রীরামপুরে এসে মাহেশ এর মন্দির না যাওয়া মানে শ্রীরামপুরে যাওয়াই বৃথা। আমরা দুপুরের পর গিয়ে পৌঁছাই মাহেশ এর মন্দিরে। আমাদের ভাগ্য এতটাই সুপ্রসন্ন যে দেবতার গর্ভগৃহে প্রবেশের অনুমতি পাই। এত সামনে থেকে দর্শন পাব সে আশা আমরা করিনি। নিম কাঠ দিয়ে নির্মিত হয়েছে জগন্নাথ দেবের মূর্তি। তাও সে সুযোগ এল যখন খুব ভালো লাগল। মূল মন্দিরের সামনে আছে একটি নাটমন্দির। এখানে এই প্রচণ্ড দাবদাহে মানুষ এসে বিশ্রাম নিতে সক্ষম হয়। আছে আলো-পাখার সুব্যবস্থা।
🔰 মূল মন্দিরের পাশে আর একটি মন্দির আছে। এখানে ছোট ছোট চারটি ঘর রয়েছে। প্রথম ঘরে রয়েছে শিব লিঙ্গ ; দ্বিতীয় ঘরে আছে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, সারদা দেবী ও স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তি ; তৃতীয় ঘরে রয়েছে নীলাচলের মূর্তি এবং চতুর্থ ঘরে রয়েছে ধ্রুবানন্দ ব্রক্ষ্মচারীর মূর্তি। ইনিই এই মন্দির ও ঠাকুর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি কীভাবে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন তাই নিয়ে একটি গল্প প্রচলিত আছে।
ছবি : মূল মন্দিরের পাশের চারটি ছোট ছোট ঘরের মন্দির
🔵 গল্পটি হল, শোনা যায় পুরীর জগন্নাথ মন্দির ভোগ দিতে চাইলে সাধু ধ্রুবানন্দ ব্রক্ষ্মচারীকে বাধা দেওয়া হয়। তিনি এতে প্রচণ্ড হতাশ ও অপমানিত বোধ করেন। এর পর তিনি দীর্ঘ অনশন সাধনা করেন। এইসময়ই তার স্বপ্নে জগন্নাথ দেবের দর্শন মেলে এবং তিনি ধ্রুবানন্দ ব্রক্ষ্মচারীর কাছে ভোগ খেতে চান। এছাড়াও ধ্রুবানন্দ ব্রক্ষ্মচারীকে নির্দেশ দেন যে মাহেশে যেতে এবং নদীর জলে ভেসে যাওয়া নিমকাঠ দিয়ে তার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে। ধ্রুবানন্দ ব্রক্ষ্মচারী তারপর মাহেশে আসেন এবং জগন্নাথ দেবের কথামতোই তার মূর্তি ও মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।
![]() |
ছবি : মাহেশের জগন্নাথ মন্দিরের মূল বিগ্রহ |
🔰 মাহেশের জগন্নাথ মন্দির থেকে হেঁটে মিনিট দশেক এগোলেই আছে জগন্নাথ দেবের মাসির বাড়ি। রথের সময় এই পর্যন্ত রথ আসে আবার উল্টোরথে ফিরে যায়।
ছবি : মাহেশের জগন্নাথ মন্দিরের বিভিন্ন অংশ
এই ছিল আমাদের শ্রীরামপুর ভ্রমণের ছোট্ট গল্প। বেশ কিছু জায়গা আমরা যেতে পারিনি। তাই শ্রীরামপুরে আবার যেতে হবে। যেগুলি দেখিনি সেগুলি দেখতে, আর যেগুলি দেখেছি সেগুলিকে আবার দেখার জন্য, আবার যাব ফ্রেডরিক্স নগরে.....😃🧡
🔴 খাওয়া-দাওয়া
🔰 শ্রীরামপুরের বেড়াতে এসে খাওয়া-দাওয়ার জন্য বিভিন্ন জায়গা রয়েছে। প্রথমেই রয়েছে 'ডেনমার্ক ট্যাভার্ন'। এখানে যদিও আসন সংখ্যা সীমিত (খুব সম্ভবত ৩৫ জন), তবুও এক মায়াবী হেরিটেজ আমেজে খেতে চাইলে যেতেই পারে লোকে। এছাড়া ডেনিশ গভর্নমেন্ট হাউস এর পাশেই নতুন সংস্করণের পরে আভিজাত্যপূর্ণ ক্যাফে ওরফে রেস্তোরা 'ভেতো' রয়েছে। সেখানেও পর্যটকরা পাবেন ট্রাডিশনাল ফিলিংস্।
🔰 তবে আমরা যেখানে গেলাম সেটা হল নবনির্মিত মুখার্জ্জী রেস্টুরেন্ট (Mukherjee's Restaurant)। খুব বেশিদিন তৈরি হয়নি এই রেস্টুরেন্ট। বিশাল জায়গা নিয়ে বটতলা মোড়ে জিটি রোডের ওপরেই তৈরি হয়েছে এই রেস্টুরেন্টটি। রেস্টুরেন্টের সবথেকে ভালো দিক হল এর কারুকার্য। অসাধারণ হেরিটেজ কারুকার্য, ঘরের দেওয়ালে অসংখ্য সব ছবি যা দেখে কোনো সংগ্রহশালা বলে ভুল হতে পারে। রেস্টুরেন্টে ঢুকেই রয়েছে বিশাল ওয়েটিং এরিয়া। সেখানে সুদৃশ্য অসংখ্য চেয়ার, সোফা আর রয়েছে অসংখ্য ঐতিহাসিক স্মৃতিবহনকারী ছবি। এরপর আমাদের ভিতরে নিয়ে গিয়ে বসালেন। সেখানেও চারিপাশের বাতাবরণ একই।
🔰 আমরা খাবার অর্ডার করেছিলাম মটন বিরিয়ানি, চিকেন টিককা কাবাব, মুর্গ মাখানি (ইণ্ডিয়ান বাটার চিকেন) এবং কেশর ফিরনি। একপ্লেট মটন বিরিয়ানির দাম ২৯০ টাকা, কিন্তু স্পেশাল মটন বিরিয়ানির দাম পড়ছে ৫২০ টাকা (যদিও সেটা মেনুকার্ডে লেখা নেই, ওনারা মুখে মুখে বললেন) যেটা আমার একপ্লেটের দামের নিরিখে অন্তত একশো টাকা বেশি মনে হয়েছে। কারণ ওই অতিরিক্ত টাকার (২৩০ এক্ষেত্রে) সাথে দশ টাকা যোগ করলে এক প্লেট চিকেন বিরিয়ানি হয়ে যাচ্ছে।
ছবি : Mukherjee's Restaurant এর অন্দরসজ্জা |
🔰 খাবারের স্বাদ সম্পর্কে বলতে হলে বলি, মটন বিরিয়ানির স্বাদ খুব মারাত্মক ভালো লাগেনি। মটনে একটু ছিবড়া ভাব রয়েছে আর খাঁসির গন্ধ রয়েছে। আর একটু সেদ্ধ করার দরকার ছিল বলে মনে হয়। ইণ্ডিয়ান বাটার চিকেন এর স্বাদ অসাধারণ। এই নিয়ে কোনও কথা হবে না। সাথে চিকেন টিককা কাবাবটিও বেশ ভালো। পুদিনার চাটনি আর টমেটো সস দিয়েছিল সাথে। এই আইটেমটা খুব ভালো লেগেছে খেতে। ফিরনি জিনিসটা আমি খুবই পছন্দ করি। কিন্তু আমার বাকি তিনজন বন্ধুর একজনেও আগে ফিরনি খায়নি। সুতরাং, এটা বরং তাদের প্রথম চেখে দেখা। আর এক্ষেত্রে তারা হতাশ হয়নি। কেশর ফিরনি বেশ ভালো। আমরা আলাদা করে স্যালাড অর্ডার করিনি। ওনারা এমনিতেই বিরিয়ানির সাথে পেঁয়াজ স্যালাড দিয়েছেন, যেটা বেশ ভালো লাগল।
🔰 খাবারের শেষে এখানে এক নতুন চমকের সামনে দাঁড়ালাম। খাবার শেষে মুখ মিষ্টি করার জন্য মৌরি, মিছরি বা টুথপ্লিক আলাদা করে দেননি বরং প্রত্যেকের জন্য একটি করে ছোট বক্স দিয়েছেন যাতে ওই দ্রব্যাদিগুলো মিশিয়ে রাখা ছিল। এই জিনিসটা বেশ ভালো ও নতুনত্ব লাগল। স্টাফদের ব্যবহার বেশ ভালো। সবমিলিয়ে ভালোই কাটল রেস্টুরেন্ট পর্ব আর খাওয়া-দাওয়া।
🔴 শ্রীরামপুর পথনির্দেশ
এবার আসি আমার মতে শ্রীরামপুর ঘুরে দেখার যাত্রাপথ। এই পথে গেলে ঘুরে দেখতে অনেকটাই সুবিধা হবে বলে মনে হয়।
🔸️ শ্রীরামপুর স্টেডিয়াম
🔸️ মাহেশ জগন্নাথ মন্দির (রথ, তোরণ)
🔸️ মাহেশ জগন্নাথ দেবের মাসির বাড়ি
🔸️ শ্মশান কালী মন্দির
🔸️ Water Treatment Plant
🔸️ শ্রীশ্রী রাধাবল্লভ জিও ঘাট
🔸️ শ্রীরামপুর রাসমঞ্চ
🔸️ শ্রীশ্রী রাধাভল্লভ জিও মন্দির
🔸️ জলকল
🔸️ আলদীন হাউস
🔸️ শ্রীরামপুর কলেজ
🔸️ ব্যাপ্টিস্ট চার্চ, ব্যাপ্টিস্ট মিশন প্রেস
🔸️ India Jute Mill
🔸️ ডেনমার্ক ট্যাভার্ন
🔸️ শ্রীরামপুর রাজবাড়ি
🔸️ চাতরা দোল মন্দির
🔸️ সেন্ট. ওলেভ চার্চ
🔸️ ডেনিশ গভর্নমেন্ট হাউস
🔸️ ভেতো
🔸️ ড্যানিশ সেমেট্রি
*-*-*-*-*-*
ফ্রেডরিক্স নগরে একদিন.....❣ (Serampore) © 2023 by Pradipta Bandyopadhyay is licensed under CC BY-NC-ND 4.0 






















.jpg)









বেশ পরিপূর্ণ ব্লগটা
ReplyDeleteধন্যবাদ ভাই
Delete