'শারদোৎসব'ই হল 'নববর্ষে'র উৎসব.... ❣
শুভ নববর্ষ। সকলকে জানাই নববর্ষের অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। এই নববর্ষ শব্দটাকে ভাঙলে দুটি শব্দ আসে, একটি হল নব যার অর্থ নতুন এবং অন্যটি হল বর্ষ, যার অর্থ বছর। অর্থাৎ দুইটি শব্দ মিলে দাঁড়াল নতুন বছর। নববর্ষ মানে হল এই নতুন বছরকেই বরণ করে নেওয়া। নববর্ষের দিন নতুন বছরের পয়লা তারিখ, নতুন বছর যেন ভালো কাটে তারই জন্য এ উৎসব।
🔶️ আমাদের বাংলা নববর্ষ পালন করা হয় বৈশাখ মাসের প্রথম দিন (ইংরেজি এপ্রিল মাস)। চৈত্রের শেষের পর নতুন বছর শুরু হচ্ছে বৈশাখ মাস থেকে। তারই প্রথম দিন নববর্ষ হিসাবে। চৈত্র মাসের শেষ দিন চড়ক উৎসবের পর তার পরের দিন নতুন বছরকে বরণ করে আপন করে নেওয়ার উৎসব।
🔷️ বর্তমান এই নববর্ষের সাথেই যুক্ত আর একটি শব্দ হল, 'হালখাতা'। এই হালখাতা কথাটি কীভাবে এল তা একটু আলোকপাত করা যাক। আসলে নববর্ষের সাথে হালখাতার কোনো সম্পর্ক নেই। মানুষ যখন প্রথমদিকে এখনকার মতোন চাষাবাদ শেখেনি, তখন এক নতুন উপায়ে ফসল ফলাত। শুকনো, পচা পাতা পুড়িয়ে একধরণের সার তৈরি করতো, যার উপরিভাগ একটু আলগা করে তার উপর বীজ ছড়িয়ে দিত। বর্ষার জল পেয়ে সেখান থেকে ফসল ফলত। এই চাষাবাদের পদ্ধতি জুমচাষ নামে পরিচিত। এরপর চাষাবাদ ক্রমশ শেখার পর বিনিময় প্রথার মাধ্যমে বিভিন্ন জিনিস দেওয়া-নেওয়া শুরু হয়। এই প্রথাতেই একজন ব্যক্তি কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে এই বিনিময়ের কাজটি করে দিত। এইভাবে দোকানদারি প্রথার উদ্ভব ঘটে। হাল অর্থাৎ লাঙলের মাধ্যমে উৎপন্ন ফসলের বিনিময়ের হিসাব রাখা শুরু হয়। খাতায় লেখা-পড়া হতে শুরু হয়, আর এতে করেই বছর শেষে নতুন খাতা শুরু করার ধারণা জন্মায়। নতুন খাতা শুরু করার জন্যে বৈশাখ মাসের প্রথম দিনকে বেছে নেওয়া হয়। আর এইভাবেই উৎপত্তি ঘটে 'হালখাতা'র।
🔶️ এই হালখাতার অনুকরণেই 'পুণ্যাহ' প্রথা চালু করেছিলেন সম্রাট আকবর। এই দিন তার অধীনে থাকা সকল জমিদাররা বাকি রাজস্ব দিয়ে যেতেন। বাংলাতে এই পুণ্যাহ প্রথা চালু করেন নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ।
⛔ এইবার কথা হল এই হালখাতার জন্য বৈশাখ মাসের প্রথম দিনই কেন বাছা হল.....!!
🔷️ ঋকবৈদিক যুগে হিম ঋতু থেকে বছর গণনা শুরু হত। পরবর্তীকালে সূর্যের সমগ্র গতিপথকে বারোভাগে বিভাজন করে বিভিন্ন মাসে ভাগ করা হয়ছিল। সমগ্র গতিপথকে ৩৬০ ডিগ্রি ধরলে প্রতি ৩০ ডিগ্রি পর্যন্ত সময়কালকে এক একটি মাস হিসাবে ধরা হয়। এতে সবার প্রথমে বৈদিক মাস হিসাবে আসে 'মাধব মাস'। মাধব মাসকে বছরের প্রথম মাস ধরা হত। শাস্ত্র মতে মাধব হল দেবতাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ আর তাই এই মাসকে শ্রেষ্ঠ মাস হিসাবে গণ্য করা হত। এই মাধব মাসই যে বৈশাখ মাস সে কথা লেখা আছে পদ্মপুরাণে সহ বিভিন্ন পুরাণে।
🔰 এইভাবেই বৈশাখ মাসের প্রথম দিন হালখাতা উৎসব পালনের রীতি শুরু হয়।
🔵 আবার, ঋগবৈদিক যুগে হিম ঋতু দিয়ে বছর গণনা শুরু হত। পরে শরৎ ঋতু থেকে বছর গণনা শুরু হয়। সংস্কৃতে শরৎ শব্দের অর্থ হল বছর। আশ্বিন মাসের শুক্ল অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে শরৎ ঋতুর আবির্ভাব ধরা হত। অর্থাৎ, বর্ষা আর শরৎ এর সন্ধিক্ষণ। এই সময়ই হল দুর্গাপুজোর সন্ধিক্ষণ। বিশিষ্ট গবেষকরা তাই মনে করেন শারদোৎসব যে কথাটা আমরা ব্যবহার করি তা বাস্তবে শরৎকালে প্রবেশকে ইঙ্গিত করে, দুর্গাপুজোকে নয়। তাই শারদোৎসবই হল নববর্ষ উৎসব।
🔵 আর এই শরৎ নববর্ষ উৎসবে ছিল এক অন্যরকম রীতি। নবমীর বলি পর্ব মিটে গেলে সেই রক্ত গায়ে মেখে হাতে খাতা নিয়ে অশ্লীল ও অশ্রাব্য গান করত কিছু মানুষ। এইরকম আচরণ করার কারণ হিসাবে মনে করা হত যে, বছরের প্রথম দিন অশ্রাব্য, অশ্লীল কথাবার্তা শুনলে দেহমন অশুচি হয়ে যায়। ফলে যে রাজ সেই বছর আর সেই দেহ স্পর্শ করতেন না। কিছুই না, অনেকটা লৌকিক বিশ্বাসজনিত ব্যাপার। তবে এই প্রথা ছিল। আর এই ছিল নববর্ষে প্রবেশের এক অনুষ্ঠান।
🔵 শোভাবাজার রাজবাড়ির নবকৃষ্ণ দেববাহাদুর এই নাচ গানকে আলাদা মাত্রা দিতে শুরু করেছিলেন বাইজি নাচ। প্রাণকৃষ্ণ দত্ত, বিনয় ঘোষ সহ বিভিন্ন লেখকের লেখা থেকে এই সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। নবকৃষ্ণ দেববাহাদুর এই নতুন বাইজি নাচের রীতি লাগু করায় ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় পুরোনো সেই অশ্লীল অশ্রাব্য ভাষায় নাচ গান। ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় এই বাইজি নাচের প্রচলনও, আর এর সাথে শরৎ এর নববর্ষ পালনের রীতিও ধীরে ধীরে লোপ পেয়ে যায়।
⛔ তথ্যসূত্র
🔰 সেকালের কলিকাতার দুর্গোৎসব - হরিপদ ভৌমিক (আখরকথা)
দারুন🤍
ReplyDelete