বর্ষণমুখর আবহাওয়ায় ভারতীয় যাদুঘরে ...........

মার্চ মাসের এক রবিবার, মেঘলা আবহাওয়া আর তারই মাঝে গিয়ে হাজির হলাম ভারতীয় যাদুঘরে। অনেক ছোটবেলায় একবার গিয়েছিলাম। সেরকম কিছুই মনে নেই। তার উপর পুরো মিউজিয়ামটাও ঘুরে দেখা হয়নি তখন। অনেকদিন ধরেই যাব যাব করছিলাম। পরীক্ষাগুলো শেষ হওয়ার পর বেরিয়ে পড়লাম। বারিনদা-কে সঙ্গে নিয়ে বর্ষণমুখর দিনে মেঘলা আবহাওয়ায় গিয়ে পৌঁছালাম ভারতীয় যাদুঘর। 


ছবি 
: গুগল

প্রথমে ৫০ টাকা করে টিকিট কেটে নিতে হল। ছবি তোলার জন্য মোবাইল ক্যামেরাতে প্রতি একজনের ৬০ টাকা। ব্যাগ রাখার বন্দোবস্ত বাইরেই আছে। কোনও টাকাপয়সা লাগে না। নিজেকেই ব্যাগ রেখে টোকেন নিয়ে আসতে হবে। ফেরার সময় আবার ব্যাগ নিজেকেই সংগ্রহ করে ওনাদের হাতে গিয়ে টোকেন রিটার্ন করতে হবে। এটা ভালো পদ্ধতি, কেননা এতে করে যে কোনো ব্যক্তি তার নিজের পছন্দমত জায়গায় তার ব্যাগ রাখতে পারবেন।

বিভিন্ন চেকিং এর পর ভিতরে ঢুকলাম। বাঁদিকে একটা ঘর ছিল যেটি এখন তালাবন্ধ। সংরক্ষণের কাজ চলছে। এখানে বিভিন্ন প্রাণীর হাড় বা অস্থি আছে। আগে যখন গিয়েছিলাম, প্রচন্ড ভিড় ছিল আর তখন এখানে ঢুকেছিলাম। এখন সেরকম কিছুই মনে নেই। এবারে আর একবার দেখতে পেলে ভালো হত।


এরপর বাঁদিকের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলাম। দোতলায় উঠে প্রথম যে ঘরটিতে ঢুকলাম সেটি বিভিন্ন চিত্রকলার ঘর। প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত বিভিন্ন চিত্রকরের আঁকা ছবি এখানে রয়েছে। প্রতি শিল্পরীতির সাথে আছে সেই শিল্পরীতি সম্পর্কে বর্ণনা (তিনটি ভাষায় - বাংলা, হিন্দি, ইংরাজি)। চিত্র প্রধানত তিনটি সময়কালকে বেছে নিয়েছে, যথা তালপত্র, কাগজ এবং পরবর্তী সময়কাল। প্রথম দুইটি ক্ষেত্র অনেকটাই একই বৈশিষ্ট্যযুক্ত। জৈন, বৌদ্ধ ধর্মাবলীর চিত্র, পাল যুগের চিত্রগুলি এখানে সংরক্ষিত আছে।


কিছুটা এগিয়ে ঠাকুর পরিবারের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা বিভিন্ন ছবি রয়েছে এছাড়া ঠাকুর পরিবারের অন্যান্যদের ছবিও কিছু রয়েছে। এছাড়া রয়েছে যামিনী রায়ের আঁকা ছবি, নন্দলাল বসুর বিভিন্ন চিত্রাবলী। ঘরের একদম ডানদিকে আছে প্রাচীন ভারতীয় তৈলচিত্র। চিৎপুর অঞ্চলের কাঁসাড়ীপাড়া শিল্পকেন্দ্র ছিল এই শিল্পের পীঠস্থান। বামাপদ মুখোপাধ্যায়, রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর তুলিতে ফুটে উঠেছে বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনী, ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি কিংবা নানারকম ঘটনা। 



এই চিত্রকলার ঘরের মধ্যেই রয়েছে আরও দুটি ঘর। এই ঘরেও রয়েছে বিভিন্ন সময়কালের চিত্রকলা, আছে বিভিন্ন পুঁথি। মুঘল আমলের চিত্রকলা, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান এমনকি আকবরের সময়কার বিভিন্ন ছবি রয়েছে। একটি অসাধারণ দৃশ্য হল একপ্রান্তে রয়েছে ক্লাসিকাল সঙ্গীত এর বিভিন্ন রাগ এর লেখনী। চিত্রকলার মাধ্যমে অপূর্বভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই জিনিসগুলো দেখলেই সময় নিজস্ব গতিতে কখন এগিয়ে যাবে বোঝাই যায় না....



এরপর আমরা এসে পৌঁছালাম মিশরের ঘরে। এই ঘরের প্রধান আকর্ষণ মমি। একটি মমি কীভাবে কবে আনা হয়েছিল, কীভাবে তৈরি হয়েছে সবকিছুই রয়েছে লেখা। এছাড়াও রয়েছে হায়োরোগ্লিফিক লিপি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য। মিশরে ব্যবহৃত বিভিন্ন দ্রব্যাদিও রাখা আছে। তবে এইগুলো আর একটু সুষ্ঠভাবে গুছিয়ে রাখলে ভালো হত।

মিশরের পর আরও সামনের দিকে এগিয়ে কিছু ঘর পাওয়া যাচ্ছে। একটি হল Mammals অর্থাৎ স্তন্যপায়ীদের ঘর। এখানে বিভিন্ন স্তন্যপায়ীদের স্কেলিটন রাখা আছে। এরপর অন্যান্য বিভিন্ন ঘরে পক্ষী জলজ উদ্ভিদ, বোটানির বিভিন্ন গাছপালা, ঔষধ, তুলো, পাট প্রভৃতির বিভিন্ন সংখ্যক প্রচুর নমুনা রয়েছে। হারবেরিয়ামের ঘরটি রয়েছে একপ্রান্তে। এখানে দুটি জিনিস খুব সুন্দর লেগেছে, যেগুলি হল একটি শোলার দুর্গা মায়ের মুখ আর একটি পাটের দুর্গা প্রতিমা।এখানে পাটের থলে, টুপি প্রভৃতি নমুনা আছে। রয়েছে বিভিন্ন রকমের কাঠের নমুনা।









 

এরপরের ঘরটি হল জীবাশ্মের ঘর। আমরা ছোটবেলাতে ভূগোল বইতে যে জীবাশ্ম পড়েছি, সেগুলিই সামনে থেকে কেমন লাগে তারই নমুনা। বিশাল বড় ঘর, সারা ঘরে চারিদিকে বিরাট বিরাট আলমারি আর ঘরের মাঝখান জুড়ে শুধু কাঁচ দিয়ে ঢাকা অসংখ্য টেবিল। এখানে নাম গুলো সবই ইংরাজিতে লেখা, বাংলাতে যেগুলি লেখা সব transliteration (যেমন, 'I' কে 'আই' লেখা, 'আমি' নয়) করা। এগুলো ঠিকঠাক বাংলা মানে দিলে উৎসাহী দর্শকদের বুঝতে সুবিধা হয়। এখানে হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলেরও প্রচুর জীবাশ্মের নমুনার নিদর্শন আছে।



এরপর আবার নীচে এলাম। এখানে উপরের জীবাশ্মের ঘরের মতোই একটি ঘর আছে, খনিজ পদার্থের। এখানে রয়েছে চেনা অচেনা অসংখ্য খনিজ পদার্থ। এখানেও নাম গুলো আগে মতোই পদ্ধতি অনুসরণ করেছে। সেটা না হলেই ভালো ছিল। বিজ্ঞানে বা ভূগোলে পড়া বিভিন্ন খনিজ পদার্থগুলিকে অনেক কাছ থেকে দেখা গেল। এখানেও ঘরের চারিদিকে রয়েছে বিশালাকার সব আলমারি আর তাতে রয়েছে খনিজ পদার্থের সম্ভার। কিন্তু আলমারির খনিজ গুলো ভালো করে গোছানো নেই। নব্বই শতাংশ জিনিসই বোঝা যাচ্ছে না।




একটি ঘর ছিল মানুষের ক্রমবিকাশের উপর। এখানে বিভিন্ন ডকুমেন্ট রাখা আছে। আছে বিভিন্ন ছবি আর স্কাল্পচার সেগুলির মাধ্যমে পুরো বিষয়টাকে সুন্দরভাবে বোঝানোর চেষ্টা হয়েছে।

এরপর শেষ ঘর এবং আমার সবচেয়ে পছন্দের যে ঘরটিতে আমরা গেলাম সেটি পুরাতত্ত্ব বিষয়ক ঘর। মৌর্য, গুপ্ত প্রভৃতি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন মূর্তি রয়েছে এখানে। বৌদ্ধ ধর্মের অসংখ্য সব স্কাল্পচার আছে,  তাদের শিল্পরীতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। এরই একটা এক্সটেনশন ঘর আছে যেখানে গান্ধার শিল্পরীতি কাঠের উপর খোদাই করে বোঝানো হয়েছে। এই ঘরে ছবি তোলা নিষিদ্ধ।
এই পুরাতত্ত্ব বিভাগের মধ্যেই একটা ঘর আছে কয়েনের উপর। ভারতবর্ষে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শাসনকালে ব্যবহৃত সোনা, রূপা, তামা, ব্রোঞ্জের আসল কয়েন তাদের ছবিসহ প্রদর্শিত করা হয়েছে। ইংরেজ আমলে ব্যবহৃত কয়েনেরও অসংখ্য নিদর্শন আছে। অসাধারণ, আকর্ষণীয় সব কালেকশন্  যাদের এই সম্পর্কে ভালোলাগা আছে তারা কখনোই হতাশ হবে না। 









মিউজিয়ামে ঢুকলে আপনি বাইরে বেরোতে পারবেন না। ওই মিনিট দুই-তিনেকের জন্য বেরোতে পারেন। ব্যাগে কিছু রাখতে বা আনতে। সুতরাং, আপনার খাওয়া-দাওয়ার জন্য একটা ব্যবস্থার দরকার হবে। মিউজিয়ামের ভিতরে একদম শেষ প্রান্তে ডানদিকে আছে ক্যান্টিন। এখানে বিভিন্ন রকমের থালি যেমন আছে, তেমনই ফ্রায়েড রাইস, চাউমিন, চিকেন কষা বা চিলি চিকেন এসবও পাওয়া যায়। আমাদের থালি নেওয়ার ইচ্ছা খুব একটা ছিল না। চিলি চিকেন শেষ হওয়ার দরুণ নিলাম ফ্রায়েড রাইস আর চিকেন কষা। সাথে একটা দশটাকার জলের বোতল। 


এই প্লেটটার দাম ১১০ টাকা। বোঝাই যাচ্ছে দাম খুব কম। এবার খাবারের স্বাদ প্রসঙ্গে আসা যাক। চিকেন কষাটা ভালো। ওইটা দিয়েই খাওয়া গেছে আসলে। ফ্রায়েড রাইস নাকি সেদ্ধ ভাত এটা বোঝার উপায় নেই। আর স্যালাড দিয়েছিল সাথে। খাবার দেওয়ার দৃশ্য দেখলে ভক্তি উঠে যাওয়ারই কথা। নেহাত খেতে হবে আর পেটে কিছু দিতে হবে তাই নয়তো এখান থেকে খাওয়ার কোনও কারণ অন্তত আমি খুঁজে পাইনি।

মিউজিয়ামের মধ্যেই এক তলাতে আছে ওনাদের একটি 'Shop'. এখানে বিভিন্ন ছোটখাট মূর্তি যেমন পাওয়া যায়, তেমনি বিভিন্ন রকমের বই আছে। সব বই ইংরাজিতে। তবে কোনও বই এমন নেই যেটা পুরো যাদুঘরকে কভার করতে পারবে। এমনকি পুরো পুরাতত্ত্ব বিভাগের ওপর বইও আমি দেখলাম না। অধিকাংশ বই পুরোনো এডিশনের, এবং প্রত্যেকটি বইয়ের মুদ্রিত মূল্যের সাথে জি.এস.টি. বসিয়ে সর্বমোট দাম নিচ্ছেন ওনারা। আমি সেরকম পছন্দমত কিছু পাই নি, তাই কিছুই নিইনি।

এছাড়া আর রয়েছে খোলা উদ্যান। মিউজিয়াম এর মাঝখানে এই মাঠে আপনি বসে সময় কাটাতে পারেন, ছবি তুলতে পারেন অথবা এখানে কোনও অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দেওয়াও হয়। শান্ত পরিবেশে কোনও অনুষ্ঠান হলে ভালোও লাগবে দর্শকদের। এখন অবশ্য অধিকাংশ ছেলেমেয়েরা ছবি তুলতেই যায়, আর যায় রিল বানাতে। তারা মিউজিয়ামে ঢুকে এইসব অসাধারণ জিনিস দেখার বা বোঝার বদলে অধিকাংশ সময়ই মাঠে অথবা ব্যালকনিতে ছবি তুলতেই ব্যস্ত।







ছবি সৌজন্যে : প্রদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায়





💖💖💖💖💖💖💖💖💖💖💖💖💖💖💖💖

Comments